দোয়া - বদ'দোয়া - বদনজর

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

> "দোয়া ব্যতীত অন্য কোনো কিছুই ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারে না এবং সৎকাজ ব্যতীত অন্য কোনো কিছুই হায়াত বাড়াতে পারে না।" 

গ্রন্থ: সুনান আত-তিরমিযী
হাদিস নম্বর: 2139


ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

> "বদ নজর সত্য; এমনকি যদি কোনো কিছু তাকদীরকে অতিক্রম করতে পারত, তবে বদ নজর তা অতিক্রম করত।" 

গ্রন্থ: সহিহ মুসলিম
হাদিস নম্বর: 2188


জিন, তাবিজ বা বদ নজরের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার জন্য ইসলামিক নির্দেশনায় কিছু আমল এবং দোয়া উল্লেখ করা হয়েছে, যা কুরআন ও হাদিস থেকে প্রমাণিত। এইসব আমল করলে আল্লাহর রহমতে এসব খারাপ প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এখানে দলিলসহ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:


তাবিজের প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে করণীয়:

1. তাওবা করা:

সর্বপ্রথম আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে, কারণ তাবিজের মাধ্যমে শিরক বা ভুল আমল হয়ে থাকতে পারে। তাওবা করলে আল্লাহ তা মাফ করে দেন।

দলিল: “তোমরা সবাই আল্লাহর দিকে তাওবা করো, হে মুমিনগণ, যাতে তোমরা সফলকাম হও।” (সুরা নূর: ৩১)



2. তাবিজের ধ্বংস করা:

যদি তাবিজ পাওয়া যায়, সেটিকে খুলে দেখতে হবে। কোনো আয়াত বা আল্লাহর নাম থাকলে সেগুলো যথাযথ সম্মান দিয়ে সংরক্ষণ করা এবং বাকি অংশ আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করতে হবে।

তাবিজের কোনো সন্দেহজনক উপাদান থাকলে (যেমন: সংখ্যা, অজানা ভাষা) এটি শুদ্ধ পানিতে ডুবিয়ে ধ্বংস করা উত্তম।


বদ নজর ও জিন থেকে বাঁচার জন্য আমল:

১. মুয়াওয়াযাতাইন পড়া (সুরা ফালাক ও সুরা নাস)

দিনে রাতে, বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যায় তিনবার করে পড়তে হবে।

দলিল: হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, “রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর উপর কোনো কষ্ট হলে সুরা ফালাক ও সুরা নাস পাঠ করতেন এবং নিজে নিজে দম করতেন।” (সহীহ বুখারি: ৫৭২৫)


২. আয়াতুল কুরসি পড়া

প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পরে এবং রাতে ঘুমানোর আগে পড়তে হবে।

দলিল: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি প্রতিদিন ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি পড়বে, আল্লাহ তার উপর একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করবেন, যা তাকে সারা রাত শয়তানের ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে।” (সহীহ বুখারি: ২৩১১)


৩. সুরা বাকারা তিলাওয়াত করা

নিয়মিত সুরা বাকারা পাঠ করলে শয়তান ও জিন ঘর থেকে পালিয়ে যায়।

দলিল: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সুরা বাকারা যেখানে পাঠ করা হয়, শয়তান সেই ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়।” (মুসলিম: ৭৭৮)


৪. সকাল-সন্ধ্যার দোয়া ও জিকির

“বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুররু মা’আসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিসসামা’ই ওয়া হুয়াস সামি’উল আলিম” - তিনবার।

দলিল: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি এই দোয়া সকাল ও সন্ধ্যায় তিনবার পড়ে, তাকে কোনো বিপদ স্পর্শ করতে পারবে না।” (আবু দাউদ: ৫০৮৮)


পুরোপুরি খারাপ প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়:

1. ইসলামিক রুকইয়া (Ruqyah):

পবিত্র কুরআনের আয়াত এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দোয়া পড়ে নিজের উপর বা আক্রান্ত ব্যক্তির উপর দম করা।

রুকইয়ার জন্য সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সুরা ফালাক, সুরা নাস, সুরা ইখলাস পড়া যেতে পারে।

দলিল: রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে রোগী বা জিনের প্রভাবিত ব্যক্তির উপর রুকইয়া করতেন। (সহীহ বুখারি: ৫৭৩৫)



2. শিরক ও বিদআত থেকে বাঁচা:

তাবিজ ব্যবহার এবং শিরকের কোনো মাধ্যম থেকে বিরত থাকা।



3. তাহাজ্জুদ পড়া:

রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করলে আল্লাহর রহমত লাভ হয় এবং তিনি শয়তান ও জিন থেকে রক্ষা করেন।


♣︎দোয়া ও জিকির:

“আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম” - প্রতিবার।

“হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল” - বিপদে পড়লে।


এই আমল ও দোয়াগুলো নিয়মিত করলে, আল্লাহর ইচ্ছায় তাবিজ, বদ নজর বা জিনের খারাপ প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। আল্লাহ সবাইকে হেফাজত করুন।

■     যদি কোন তাবিজ খুঁজে না পাওয়া যায়:


যদি তাবিজ বা খারাপ প্রভাব সৃষ্টিকারী কোনো বস্তু খুঁজে না পাওয়া যায়, তবে মনে রাখতে হবে যে তাবিজ বা জাদুর প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ইসলামিক দৃষ্টিকোণে দোয়া, আমল এবং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলই প্রধান করণীয়। নিচে সেই পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়গুলো উল্লেখ করা হলো:


১. নিয়মিত রুকইয়া (Ruqyah) পড়া:

রুকইয়া হচ্ছে কুরআনের আয়াত ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া দিয়ে শারীরিক ও আধ্যাত্মিক সমস্যা নিরাময়ের প্রক্রিয়া। তাবিজ না পেলেও নিয়মিত রুকইয়া করার মাধ্যমে তাবিজের প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব।

● রুকইয়া করার পদ্ধতি:

1. নিজে অজু অবস্থায় থাকতে হবে।


2. শান্ত পরিবেশে বসে তিলাওয়াত করা।


3. নিম্নোক্ত আয়াত ও সুরাগুলো পাঠ করা:

সুরা ফাতিহা (৭ বার)

আয়াতুল কুরসি (সুরা বাকারা: ২৫৫)

সুরা বাকারা-এর শেষ দুই আয়াত (২৮৫-২৮৬)

সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক, এবং সুরা নাস (প্রতিটি ৩ বার)



4. পাঠ শেষে হাতের উপর ফুঁ দিয়ে সারা শরীরে হাত বুলানো।



■ দলিল:

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
"তোমরা নিজেদের উপর কুরআনের আয়াত দ্বারা চিকিৎসা করো।"
(মুসলিম: ৫৮৬)


২. আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা:

যদি তাবিজ না পাওয়া যায়, তাহলে দোয়া ও ইস্তিগফার করতে হবে। আল্লাহর সাহায্য চাওয়া উচিত নিম্নোক্ত দোয়া দ্বারা:

■ দোয়া:

1. “আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম।”


2. “আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিন হুমাযাতিশ শায়াতিন।”
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। (সুরা মুমিনুন: ৯৭-৯৮)


৩. বদ নজর বা জাদুর প্রভাব থেকে বাঁচার আমল:

1. সকাল-সন্ধ্যার জিকির:

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মূলকু ওয়ালাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাই’ইন কাদির।” - ১০ বার।

“বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুররু...” - ৩ বার।



2. ঘরে সুরা বাকারা তিলাওয়াত করা:

শয়তান এবং জিনের প্রভাব দূর করতে।
দলিল: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ঘরে সুরা বাকারা পাঠ করা হয়, সেখানে শয়তান প্রবেশ করে না।” (সহীহ মুসলিম: ৭৭৮)



3. তাহাজ্জুদ নামাজ:

রাতে তাহাজ্জুদ পড়া শক্তিশালী রক্ষাকবচ।
দলিল: “রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ো, কারণ তা পাপ মোচন করে, রোগ থেকে আরোগ্য দেয়, এবং শয়তানের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।” (তিরমিজি: ৩৫৪৯)

৪. নিয়মিত আমলের তালিকা:

প্রতিদিন আয়াতুল কুরসি ও সুরা ফালাক ও সুরা নাস তিনবার করে পড়া।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায় করা।

“সুবহানাল্লাহি ওয়াবিহামদিহি সুবহানাল্লাহিল আজিম।” - নিয়মিত পড়া।

আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রেখে সব আমল করা।


৫. জাদু ও শয়তানি প্রভাব ধ্বংসে বিশেষ দোয়া:

■ সুরা ইউনুস (১০: ৮১-৮২):
“যখন মুসা বললেন: তোমরা যা নিয়ে এসেছ, তা জাদু। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা বাতিল করবেন। আল্লাহ ফাসাদ পছন্দ করেন না।"

উচ্চারণ:

আয়াত ৮১:
ফালাম্মা আলকাও, ক্বালা মূসা, মা জিতুম বিহিস্ সিহর। ইন্নাল্লাহা সাইউবতিলুহ। ইন্নাল্লাহা লা ইউসলিহু আমালাল মুফসিদীন।

আয়াত ৮২:
ওয়া ইউহিক্কুল্লাহুল হাক্কা বিকালিমাতিহি, ওয়ালাউ কারি-হাল মুজরিমুন।

■ সুরা তাহা (২০: ৬৯):
“আল্লাহর বান্দা হলে শয়তানের ক্ষতি তোমার কোনো কাজে আসবে না।”

উচ্চারণ:

ওয়াল্কি মা ফি ইয়ামিনিকা তালকফ্ মা সানাউ। ইন্নামা সানাউ কাইদু সাহির। ওয়ালা ইয়ুফলিহুস সাহিরু হাইছু আত।


তাবিজ না পেলেও, এই আমল এবং দোয়া করলে আল্লাহর ইচ্ছায় তাবিজের বা জাদুর প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। নিয়মিতভাবে এইসব আমল ও দোয়া চালিয়ে যাওয়া উচিত। আল্লাহ তাআলা সবাইকে হেফাজত করুন।


Comments

More Interesting Topics

খ্রিষ্টানদের বড়দিন আর মুসলমানদের ধ্বংসের দিন

শরীয়তের পোশাকের সুন্নত ও নীতিমালা

প্রশংসা করার কুফল ও সঠিক পদ্ধতি