শরীয়তের পোশাকের সুন্নত ও নীতিমালা

#jarifurrahim
♣︎ ইসলামের দৃষ্টিতে পোশাক: জানা যাক পোশাক সংক্রান্ত যাবতীয় সকল নির্দেশনা এবং আলোকিত হোক পোশাক নিয়ে সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ আর অন্ধকার


ইসলাম ধর্মে পোশাক মানুষের সৌন্দর্য, শালীনতা ও ইবাদতের প্রতীক। এটি শুধু দেহ আবৃত করার জন্য নয়, বরং মানুষের আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও সামাজিক মান বজায় রাখার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কুরআন ও হাদিসে পোশাকের ব্যাপারে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা রয়েছে, যা মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর পাশাপাশি পোশাকের ব্যবহারিক ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব তুলে ধরে।

♠︎ ইসলামের আলোকে পোশাকের সংজ্ঞা

ইসলামের দৃষ্টিতে পোশাক বলতে বোঝায় এমন বসন যা মানুষের দেহের আবশ্যক অংশগুলোকে ঢেকে রাখে, শালীনতা বজায় রাখে এবং সমাজে একজন মুসলমানের পরিচয় তুলে ধরে।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:

"হে আদমসন্তান! আমি তোমাদের জন্য পোশাক দান করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং শোভা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আর তাকওয়ার পোশাকই সর্বোৎকৃষ্ট।"

(সূরা আল-আ'রাফ: ২৬)


এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, পোশাকের মূল উদ্দেশ্য হলো লজ্জাস্থান আবৃত করা এবং আল্লাহভীতি বা তাকওয়া প্রকাশ করা। তাই ইসলামে পোশাক কেবল বাহ্যিক আবরণের বিষয় নয়, এটি মনের শুদ্ধতা ও তাকওয়ার প্রতীক।


♠︎ পোশাকের উদ্দেশ্য

1. লজ্জাস্থান আবৃত রাখা: এটি ইসলামের মৌলিক নীতি। নবী করিম (সা.) বলেন,

"লজ্জা ঈমানের অঙ্গ।" (সহীহ মুসলিম: ৩৫)

2. আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন: শালীন ও পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা ইসলামের শিক্ষা।

3. পরিচিতি বজায় রাখা: মুসলিমরা তাদের পোশাকের মাধ্যমে নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখবে।

4. সমাজে শালীনতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা: পোশাক এমন হওয়া উচিত যা ফিতনা বা অন্য কোনো খারাপ প্রভাব সৃষ্টি না করে।


পোশাকের প্রকারভেদ

ইসলামে পোশাকের প্রকারভেদ মূলত লিঙ্গভেদ, পরিস্থিতি ও পরিবেশভেদে নির্ধারিত হয়।

1. পুরুষের পোশাক:

পুরুষের জন্য নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত আবৃত রাখা ফরজ। প্রমিত পোশাকগুলো যেমন জুব্বা, শাল, শার্ট-প্যান্ট পরা বৈধ, যদি তা শালীন হয়।

2. মহিলার পোশাক:

মহিলাদের জন্য পুরো শরীর আবৃত করা এবং এমন পোশাক পরা ফরজ যা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।

আল্লাহ বলেন:

"তারা যেন তাদের আঁচল দিয়ে বক্ষদেশ আবৃত করে।" (সূরা আন-নূর: ৩১)


■ ইসলামের আলোকে পোশাকের ধরন

ইসলামে পোশাকের ধরন নির্ধারণ করা হয় চারটি মূলনীতির ওপর।

1. শালীনতা বজায় রাখতে হবে।

2. অশ্লীলতা বা ফিতনা সৃষ্টি করবে না।

3. পুরুষরা মহিলাদের পোশাক এবং মহিলারা পুরুষদের পোশাক পরিধান করবে না।

নবী করিম (সা.) বলেন,

"যারা বিপরীত লিঙ্গের পোশাক পরে, তাদের উপর অভিশাপ।" (আবু দাউদ: ৪০৯৮)

4. ইসলামের মৌলিক আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না।


পরিবেশের সাথে মানানসই পোশাক

ইসলাম পরিবেশের সাথে মানানসই পোশাক পরার অনুমতি দিয়েছে। 

♥︎ সুন্নতি পোশাকের ধরন

সুন্নতি পোশাক বলতে বোঝায় এমন পোশাক যা শালীন, আরামদায়ক এবং পরিবেশের উপযোগী। এটি নির্দিষ্ট কোনো রঙ বা ধরনে সীমাবদ্ধ নয়। নবী করিম (সা.) বিভিন্ন ধরনের পোশাক পরেছেন, যার মধ্যে শাল, কুর্তা, তহবন্দ উল্লেখযোগ্য। পরিস্থিতি এবং প্রেক্ষাপট এর উপর নবী করীম(সা:) এর পোশাকের পরিবর্তন লক্ষণীয় ছিল। তবে তিনি নির্দিষ্ট করে কোন পোশাককে ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য নির্ধারণ করে দেননি।


সামাজিক ভুল ধারণা ও ইসলামের প্রমাণ


আমাদের সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত যে, শুধুমাত্র পায়জামা-পাঞ্জাবি বা জুব্বা পরলেই এটি ইসলামের পোশাক। কিন্তু শার্ট-প্যান্ট পরা হারাম নয় যদি তা শালীন হয় এবং শরীরের আবশ্যক অংশ ঢেকে রাখে। পোশাকের ব্যাপারে যত হাদিস রয়েছে সেগুলোর উল্লেখযোগ্য শর্ত সমূহ এবং শার্ট-প্যান্ট ও কোটের ইতিহাস সম্পর্কে দেখলেই তা বোঝা যায়। বরং পাঞ্জাবি, জুব্বা, কুর্তা ইত্যাদি পোশাকগুলো নবীজি জন্মের অনেক আগে থেকেই আরবের প্রচলিত পোশাক হিসেবে মানুষ পরিধান করত, এই দিক থেকে এই পোশাকগুলো মুসলমানদের সূচনা করা পোশাকের অন্তর্ভুক্ত নয়। আর পায়জামার প্রচলন তো ভারতীয় সংস্কৃতি থেকে উৎপত্তি ছিল। পরবর্তীতে মুঘল আমলে এটি মুসলিমদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়। পায়জামা সদৃশ্য ধরনের পোশাক, যাকে আরবিতে "সিরওয়াল" বলা হয়; এটি পরিধান করার উল্লেখ হাদীসে পাওয়া যায়। তবে এটি মূলত আরবের বাইরের দেশের পোশাক ছিল। যা খুব কম আরববাসীরা ব্যবহার করতেন। সুতরাং বলা যায় নবীজি নিজে, নিজ দেশ ও এলাকার মানুষের প্রচলিত পোশাকে গ্রহণ করেছিলেন।

ইসলামে বাহ্যিক সৌন্দর্যকে অনুমোদন করা হয়েছে, তবে তা শালীন ও তাকওয়ার ভিত্তিতে হতে হবে।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:

"আল্লাহ সুন্দর এবং সৌন্দর্য পছন্দ করেন।"

(সহিহ মুসলিম: ৯১)

তবে এ কথা চরম সত্য যে নবীজি তার জীবনের যে কাজটি যেভাবে করেছেন আমাদের হুবহু সেইভাবে কাজগুলি করার মধ্যে বরকত ও কল্যাণ অবশ্যই রয়েছে। তবে এই বিষয়গুলি নিয়ে তর্ক করে; নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে অন্যান্য আমল ধ্বংস করা কাম্য নয়। অবশ্যই উৎসাহ করা উচিত সুন্নত অনুসরণের জন্য।

"ইসলামের সত্যিকারের শিক্ষা হল ভারসাম্য এবং সামঞ্জস্য বজায় রাখা। শালীনতা ও তাকওয়া বজায় রেখে পোশাক পরা ইসলামের মূল আদর্শ।"


☆★পোশাকের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা♠︎♤

ইসলামে পোশাকের ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, যা মানুষের শালীনতা, লজ্জাস্থান রক্ষা এবং সামাজিক ফিতনা এড়ানোর জন্য আরোপিত। কুরআন ও হাদিসে এই বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা রয়েছে। নিচে দলিলসহ সেগুলো উল্লেখ করা হলো:

১. পুরুষদের জন্য রেশম এবং সোনা ব্যবহার নিষিদ্ধ

"আলী ইবনে আবু তালিব (রা.) বলেন, 'নবী করিম (সা.) রেশম এবং সোনাকে আমার ডান হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এগুলো আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম এবং নারীদের জন্য হালাল।'"

(সুনান আবু দাউদ: ৪০৪৬)

২. লিঙ্গভেদে পোশাকের পার্থক্য মেনে চলা

"নবী করিম (সা.) বলেন, 'আল্লাহ সেই পুরুষদের উপর অভিশাপ দেন যারা নারীদের মতো পোশাক পরে এবং সেই নারীদের উপর অভিশাপ দেন যারা পুরুষদের মতো পোশাক পরে।'"

(সহিহ বুখারি: ৫৮৮৫)

৩. অত্যন্ত আঁটসাঁট পোশাক পরা নিষিদ্ধ

"আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত: নবী (সা.) বলেছেন, 'আমার উম্মতের মধ্যে এমন একদল নারী আসবে যারা পোশাক পরা থাকলেও নগ্ন থাকবে। তারা ফিতনা সৃষ্টি করবে এবং অন্যদেরও ফিতনায় ফেলবে। তারা জান্নাতের গন্ধ পাবে না।'"

(সহিহ মুসলিম: ২১২৮)

৪. গর্ব ও অহংকার প্রকাশ করার জন্য পোশাক পরা নিষিদ্ধ

"আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, নবী (সা.) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি অহংকারের সঙ্গে কাপড় টেনে নিয়ে চলে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে মুখোমুখি করবেন না।'"

(সহিহ বুখারি: ৩৪৬৫)

৫. দেহ প্রদর্শন করে এমন পোশাক নিষিদ্ধ

"নবী করিম (সা.) বলেন, 'যে ব্যক্তি এমন পোশাক পরে যা তার শরীরের অংশ প্রকাশ করে, সে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট ঘৃণিত।'"

(তিরমিজি: ১৭৩১)

৬. অনুকরণমূলক পোশাক পরা নিষিদ্ধ

"ইবনে ওমর (রা.) বলেন, নবী (সা.) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি কোনো জাতির অনুকরণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।'" - উক্ত হাদিসটি পোশাক এবং বিভিন্ন আচার ও প্রথার উপর বলা হয়েছে।

(আবু দাউদ: ৪০৩১)


অন্য ধর্মের ধর্মীয় বা জাতির ইসলাম বিরোধী পোশাক পরিধানের মাধ্যমে তাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ প্রকাশ করা ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

( হিন্দু পুরোহিতের পোশাক, খ্রিস্টানদের গলার সাদা কাপড়, বোরখা ত্যাগ করা ইত্যাদি )


●○শেষ কথা: কুরআন এবং হাদিসে পোশাক নিয়ে কিছু স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট পোশাক চাপিয়ে দেয়নি, বরং শালীনতা ও তাকওয়ার ভিত্তিতে পোশাক নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় পরিবেশের সাথে মানানসই এবং নিজের শোভা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে নিজ দেশের মানুষের বহুল ব্যবহৃত পোশাকগুলো পরিধান করাতে ইসলামে বাধা নেই। - আল্লাহতালা মানুষের অন্তরের উদ্দেশ্যের উপর বিচার করেন।

কুরআন ও হাদিসে যা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি, তা অনুমানের ভিত্তিতে নিষিদ্ধ করা ইসলামের নীতির বিরুদ্ধে।

মানুষের ব্যক্তিগত অনুমানের উপর ভিত্তি করে কাউকে পোশাক নিয়ে হেয় প্রতিপন্ন করা বা জোরপূর্বক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া শরিয়তের অপছন্দনীয় কাজ।


॥ লেখক/আলোচক - 

জি. কে. এম. জারিফ উর রহিম।

#jarifurrahim #jarif #জারিফ #جَرِيفْ




Comments

More Interesting Topics

খ্রিষ্টানদের বড়দিন আর মুসলমানদের ধ্বংসের দিন

প্রশংসা করার কুফল ও সঠিক পদ্ধতি