আলেম ও এলেম


আলেম কারা? আপনি কাদেরকে আলেম বলেন? কোন দলিলের ভিত্তিতে কেউ নিজেকে বা অপরকে আলেম হিসেবে পরিচয় দেয়? আমাদের জানা আলেম কি শুধু সামাজিক পরিচয়ে আলেম? নাকি ইসলামে বর্ণিত বর্ণনা অনুযায়ী দ্বীনি পরিচয়ে আলেম?

》আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে বর্ণিত আলেমদের পরিচয় জানা যাক《

সকল ব্যক্তি বিশেষের নিজস্ব মতামত ও দাবিকে সম্পূর্ণ আলাদা সরিয়ে রেখে, সরাসরি কোরআন এবং হাদিস থেকে "আলেম" কারা আর কিভাবে আলেম হিসেবে আল্লাহর কাছে কবুল হওয়া সম্ভব সে বিষয়ে আলোচনা করা যাক:


● আমার এই ব্যাপক লেখনিটি প্রতিটি মুসলমানকে তার দ্বীন ইসলামের সাথে নিজের অবস্থান থেকেই সরাসরি নিজের আমলের উপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার যোগ্যতা ও দক্ষতার দলিল দেবে। যে, যে ভাষার হোক; যে, যে শিক্ষায় শিক্ষিত হোক; যে, যে কর্মের হোক; যে, যে বর্ণের হোক; প্রত্যেক মুসলমানকে ইসলামের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কের প্রমাণ দেখাবে এই লেখনি। প্রতিটি মুসলমান তা নিজ অবস্থান থেকে আল্লাহর কাছে সমান এবং দ্বীনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আল্লাহ তায়ালা সবার জন্য সমান রেখেছেন তা মানুষকে জানাবে।

আল্লাহতালার অশেষ হিকমত ছিল এটি যে তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম কে নিরক্ষর অর্থাৎ অক্ষরজ্ঞানহীন রেখেছিলেন এবং এরপর তার কাছে প্রথম আয়াত নিয়ে এসেছিলেন - ইক'র অর্থাৎ পড়ো। সুতরাং কেয়ামতের দিন "আমি অশিক্ষিত ছিলাম তাই ইসলামের জ্ঞান অর্জন করতে পারিনি" এই কথা বলার সুযোগ কারোর থাকবে না।

>> আপনি বলবেন তিনি নবী ছিলেন আর আমরা সাধারণ মানুষ তাই আমাদের আর তার সাথে ঘটবে না। কিন্তু এখানেও তার কাছে আয়াত আসার মুহূর্তের সময় নিয়ে আমাদের জন্য শিক্ষার অনেক কিছু রয়েছে। নবীজির কাছে প্রথম আয়াত নাযিল হয় 40 বছর বয়সে কিন্তু তার আগে কেন হলো না? নবীজির এই সময় এক কাছের ব্যক্তির মৃত্যু তাকে ব্যতীত করে এবং তাকে নির্জনে চিন্তা ফিকির করতে বাধ্য করে। 

চলুন একটু বোঝা যাক কোন পরিবর্তনের উপর আল্লাহতালা তার কাছে নবুওয়াতের যাত্রা শুরু করেন।

নবুয়তের আগের সময়ে নবীজির মধ্যে একটি বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। তিনি সমাজ থেকে কিছুটা দূরে থাকতেন এবং ধীরে ধীরে আল্লাহর একত্ববাদের দিকে মনোনিবেশ করছিলেন।

• তিনি হেরা গুহায় নির্জনে ধ্যান করতেন এবং গভীরভাবে চিন্তা করতেন।

• তিনি মূর্তিপূজার অসারতা অনুভব করতেন এবং এক সৃষ্টিকর্তার সন্ধান করতেন।

• তাঁর মধ্যে আত্মশুদ্ধি এবং সত্যের অন্বেষণের আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিচ্ছিল।

তার সত্যসন্ধানের প্রতি এই পেরেশানি এবং ধ্যান আর জীবন ও মৃত্যু নিয়ে চিন্তা ফিকির থেকেই তার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নাযিল হলো। আল্লাহ ততক্ষণ মানুষের কাছে জ্ঞান প্রেরণ করেন না, যতক্ষণ না মানুষ নিজ জাগ্রহে সৃষ্টি এবং আখিরাত নিয়ে জানার আগ্রহ অন্তরে অনুভব করে। 

{ একই বিষয়ে আমাদের সাথেও যদি আমরা জ্ঞান সন্ধানের ইচ্ছা অন্তরের তীব্রভাবে অনুভব করি এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি নিশ্চয়ই আমাদের কাছেও আল্লাহর পক্ষ থেকে জ্ঞান পৌঁছে যাবে হাজারো ওসিলার মারফত }


|| এবার চলুন লেখার মূল গভীরের দিকে যাওয়া যাক কিভাবে নিজেরা এবং সকলে, নিজেদেরকে ইসলামের দ্বীনের জ্ঞানের উপর আলোকিত করতে পারি।

আলেমদের (জ্ঞানীদের) মর্যাদা সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসে বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়েছে। আলেমদের জ্ঞান ও দায়িত্বের গুরুত্ব সম্পর্কে কোরআনের বিভিন্ন আয়াত এবং নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাদিসে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। নিচে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য আয়াত এবং হাদিস তুলে ধরা হলো:


1. আলেমদের মর্যাদা সম্পর্কে:

📓 “আল্লাহ তাআলা তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদের মর্যাদা বহু গুণে উন্নীত করবেন।”
(সূরা মুজাদালা: ১১)


2. আল্লাহর ভয় ও আলেমদের স্থান সম্পর্কে:
📓 "নিশ্চয়ই আল্লাহর মধ্যে যারা ভয় রাখে তারা হচ্ছে তাঁর বান্দাদের মধ্যে আলেমরা।"
(সূরা ফাতির: ২৮)


3. জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব সম্পর্কে:
📓 “বলো, যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?”
(সূরা আয-যুমার: ৯)

                                       হাদিস:

1. আলেমদের মর্যাদা সম্পর্কে:
📚 নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি জ্ঞান অন্বেষণের পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।"
(মুসলিম শরীফ: ২৬৯৯)


2. আলেমরা নবীদের উত্তরাধিকারী:
📚 "আলেমরা নবীদের উত্তরাধিকারী। নবীরা দিরহাম ও দিনার (সম্পদ) রেখে যান না, বরং রেখে যান জ্ঞান। যে এই জ্ঞান গ্রহণ করলো, সে পরিপূর্ণ অংশ লাভ করলো।"
(তিরমিজি: ২৬৮২, আবু দাউদ: ৩৬৪১)


3. ইলম অর্জনের নির্দেশ:
📚 "জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজ।"
(ইবন মাজাহ: ২২৪)


4. আলেমের তুলনা:
📚 নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"আলেম ও ইবাদতকারী (অজ্ঞ) ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য হলো চাঁদ ও নক্ষত্রের মধ্যে পার্থক্যের মতো।"
(তিরমিজি: ২৬৮৩)

5. আলেমদের মর্যাদা:
📚 "আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন সেই ব্যক্তিকে উঁচু মর্যাদা দান করবেন, যে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করেছে এবং তা প্রচার করেছে।"
(মুসলিম শরীফের সংকলন থেকে প্রাসঙ্গিক অর্থে)


এই পর্যন্ত আসার পর এবার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চিন্তাশীল প্রশ্ন করা যাক। আমাদের প্রচলিত সমাজ অনুযায়ী মাদ্রাসা থেকে একটি নির্দিষ্ট শিক্ষা নেওয়ার পর কিছু সংখ্যক নির্দিষ্ট ব্যক্তিগণকে আলেম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে কুরআন এবং হাদিসের সরাসরি অর্থ ও ব্যাখ্যার আলোকে কোন বিষয়ের উপর যার জ্ঞান রয়েছে তাকে ওই বিষয়ের আলেম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যাচ্ছে। যেহেতু সেখানে নির্দিষ্ট করে কোন জ্ঞান অর্জনের সীমারেখার উল্লেখ নেই সুতরাং যে যতটুকু বিষয়ের সীমা পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হবে, তাকে ততটুকু সীমার ভেতরে একজন আলেম বলা হলে ইসলামের দৃষ্টিতে তা অন্যায় বা ভুল হবে না। তাহলে একজন ব্যক্তি কি নিজ থেকে জানার মাধ্যমে নিজ উদ্যোগকে কিছু সীমার মধ্যে আলেম হতে পারেন? নাকি মাদ্রাসা একমাত্র আলেম হওয়ার জন্য উপায়?


কোরআন ও হাদিসে আলেম বলতে মূলত জ্ঞানীদের বোঝানো হয়েছে। তবে আলেম হওয়ার জন্য জ্ঞানের কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণের কথা কোরআন বা হাদিসে সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। এটি মূলত একটি দায়িত্বপূর্ণ এবং ধারাবাহিক জ্ঞানচর্চার প্রক্রিয়া।


আলেমের সংজ্ঞা কোরআন ও হাদিস অনুযায়ী:

1. আল্লাহর ভয়
📓 কোরআনে আলেমদের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে:
"নিশ্চয়ই আল্লাহর মধ্যে তাঁর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেমরাই ভয় পায়।"
(সূরা ফাতির: ২৮)

এখানে বোঝা যায় যে প্রকৃত আলেম সেই ব্যক্তি, যার জ্ঞান তাকে আল্লাহর ভয় এবং তাকওয়ার দিকে পরিচালিত করে।


2. জ্ঞানচর্চার গুণ

📚 নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"প্রত্যেক মুসলিম পুরুষ ও নারীর জন্য জ্ঞান অন্বেষণ করা ফরজ।"
(ইবন মাজাহ: ২২৪)

এই হাদিস ইঙ্গিত দেয় যে জ্ঞানচর্চার দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত। যে যত বেশি জ্ঞান অর্জন করবে এবং সেই জ্ঞানকে কাজে লাগাবে, তার মর্যাদা ততই বাড়বে।

বর্তমান সমাজে আলেম হওয়ার প্রচলন:

মাদ্রাসা শিক্ষা পদ্ধতি ইসলামিক জ্ঞানের একটি প্রতিষ্ঠিত কাঠামো, যা দীর্ঘদিন ধরে জ্ঞান প্রচারের মাধ্যম হয়ে আসছে। তবে কোরআন ও হাদিসে আলেম হওয়ার জন্য শুধু মাদ্রাসায় পড়াশোনাই শর্ত নয়। বরং প্রকৃত আলেম হওয়ার জন্য প্রয়োজন:

1. সঠিক আকিদা ও বিশুদ্ধ জ্ঞান: কোরআন, হাদিস এবং ইসলামের মূলনীতি বোঝার জন্য পরিশ্রমী চেষ্টা।

2. আমল: অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী নিজের জীবনে তা বাস্তবায়ন করা।

3. দায়িত্বশীলতা: জ্ঞান প্রচার ও সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করা।


ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় আলেম হওয়া:

কোনো ব্যক্তি যদি মাদ্রাসা বা আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে কোরআন ও হাদিসের গভীর জ্ঞান অর্জন করেন এবং সেই অনুযায়ী আমল করেন, তাহলে তিনিও তাঁর অর্জিত জ্ঞানের পরিধির মধ্যে একজন "আলেম" হিসেবে গণ্য হতে পারেন। কারণ আলেম হওয়ার মৌলিক শর্ত হলো:

• ইলম (জ্ঞানের গভীরতা)
• আমল (আচরণে জ্ঞানের প্রয়োগ)
• তাকওয়া (আল্লাহভীতি)

সুতরাং আলেম হওয়া মানে কেবল মাদ্রাসা থেকে আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন করা নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে আলেম সেই ব্যক্তি, যিনি কোরআন ও হাদিসের সঠিক জ্ঞান অর্জন করেন, তা নিজের জীবনে প্রয়োগ করেন এবং অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেন।

অতএব, যে কেউ যদি সঠিকভাবে কোরআন ও হাদিস নিয়ে গবেষণা, চিন্তাশীলতা এবং আমল শুরু করে, তার জ্ঞানের পরিধি অনুযায়ী তাকে সেই বিষয়ের একজন আলেম বলা যেতে পারে। তবে এটি একটি দায়িত্বপূর্ণ মর্যাদা, কারণ ইসলামে আলেমদের জন্য গাফিলতি ও ভুল ব্যাখ্যার বড় শাস্তির কথা বলা হয়েছে।


এবার আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া যাক তা হলো আলেম হতে হলে জ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক কিন্তু এই বিশুদ্ধ জ্ঞান কোথায় পাওয়া সম্ভব? নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে কোরআনের মধ্যেই পরিপূর্ণ এবং বিশুদ্ধ জ্ঞানের ভাণ্ডার রয়েছে এবং তার যথাযথ বিস্তারিত ব্যাখ্যা হাদিস দ্বারা জানা সম্ভব। সুতরাং মানুষকে দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় কল্যাণ ও সফলতা সহ সৃষ্টি জগতের সমস্ত জ্ঞান খুঁজতে হলে কোরআন এবং হাদিস থেকেই বিশুদ্ধভাবে পাওয়া সম্ভব। যেহেতু এই জ্ঞান সরাসরি আল্লাহতালার পক্ষ থেকে মানুষের জন্য এসেছে।

তাহলে প্রশ্ন হলো আমাদের সমাজে কেন সাধারণ মানুষদেরকে সরাসরি কুরআন এবং হাদিসের অর্থ 
বুঝতে পড়তে জানতে নিষেধ করা হয়? কেন বলা হয়ে থাকে কোরআন ও হাদিসের সঠিক অর্থ এবং ব্যাখ্যা আমাদের সাধারণ মানুষের বোঝা সম্ভব নয়? যেখানে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা নিজে দাবি করছেন; তিনি কোরআনকে সহজ করেছেন মানুষের জন্য। আরো বলেছেন সকল বিষয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে এই কিতাবে ইত্যাদি এমন অনেক আয়াত। এরপরও যদি আমি বলি কোরআনের অর্থ বোঝার জন্য আলাদা ব্যাখ্যা এবং জ্ঞানের প্রয়োজন তাহলে প্রশ্ন হল আল্লাহতালা চাইলে তো নিজেই কুরআনের মধ্যে সেই ব্যাখ্যাগুলো দিয়ে দিতে পারতেন। তিনি কেন তা করেননি? কোরআনুল কারীমের সর্বপ্রথম যে সূরার যে আয়াতটি নাযিল করা হয়েছে সে আয়াতের প্রথম শব্দই ছিল "ইক'র" অর্থাৎ পড়ো। আল্লাহতালা সর্বপ্রথম এই আদেশই করছেন মানুষকে পড়ার জন্য। 

📓 পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।
সূরা আলাক- ০১

>> এখানে অনেকে আরবি ভাষা শেখার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক উল্লেখ করবেন হয়তো, চলুন তাহলে এই বিষয়টি সম্পর্কেও আরো পরিষ্কার জানা 
যাক।

📓 "আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিও এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্যও। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে"- সূরা আর রুম ২১।

ভাষার বৈচিত্র নিয়ে তিনি জানেন আর তা উল্লেখ ও করেছেন তবে তিনিই তার কোরান সব ভাষার মানুষের কাছে পৌঁছানোর নিশ্চয়ই পরিকল্পনাও রেখেছেন ।

এই প্রশ্ন অত্যন্ত গভীর এবং চিন্তাশীল। এটি ইসলামী শিক্ষার মূল কাঠামো এবং কোরআন-হাদিসের অনুধাবন সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত করে। আল্লাহ তায়ালা কোরআনে মানুষকে জ্ঞান অর্জনের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং এটিও সত্য যে কোরআনকে সহজ করে দেওয়া হয়েছে। তবে একইসাথে এই বিষয়ে কিছু সূক্ষ্মতা রয়েছে, যা বুঝতে হলে সমন্বিতভাবে কোরআন ও হাদিসের আলোকে আলোচনা করা প্রয়োজন।


■ প্রথমত: কোরআনের নির্দেশনা জ্ঞান অর্জনের জন্য

1. কোরআনকে সহজ করা হয়েছে

📓 "আমি তো কোরআনকে স্মরণের জন্য সহজ করে দিয়েছি। তবে আছে কি কেউ, যে শিক্ষা গ্রহণ করবে?"
(সূরা আল-কামার: ১৭)

এখানে "স্মরণ" বলতে বোঝানো হয়েছে কোরআন পাঠ, উপলব্ধি এবং তার শিক্ষা গ্রহণ করা। অর্থাৎ, কোরআন সবার জন্য সহজতর করা হয়েছে।



2. কোরআন বিশ্লেষণ ও অনুধাবন করার আহ্বান

📓 "তারা কি কোরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে না? যদি এটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হত, তবে তারা এতে বহু বিচ্যুতি পেয়ে যেত।"
(সূরা আন-নিসা: ৮২)

এই আয়াতে মানুষকে কোরআন নিয়ে গভীর চিন্তা ও গবেষণার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।


3. জ্ঞানীদের মর্যাদা ও দায়িত্ব

📓 "তোমাদের মধ্যে যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?"
(সূরা আয-যুমার: ৯)

এটি ইঙ্গিত করে যে বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন এবং তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

■ দ্বিতীয়ত: সরাসরি কোরআন-হাদিস পড়া এবং আলেমদের ভূমিকা

কোরআন ও হাদিস সরাসরি পড়া এবং বোঝা অবশ্যই প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব ও অধিকার। তবে কোরআন ও হাদিসের গভীর অর্থ ও বিধানগুলো যথাযথভাবে বোঝার জন্য কিছু বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন:

1. ভাষার জটিলতা ও প্রসঙ্গ
কোরআন আরবি ভাষায় নাযিল হয়েছে, এবং সেই সময়ের আরবি ভাষার গভীরতা ও ব্যঞ্জনা বোঝা সাধারণ মানুষের জন্য সহজ নয়। যেমন:

"নাসিখ ও মানসুখ" (কোন আয়াতের বিধান পরবর্তী আয়াতে রহিত হয়েছে)।
"শানে নুযূল" (কোন প্রসঙ্গে আয়াত নাযিল হয়েছে)।
"মুহকাম ও মুতাশাবিহ" (স্পষ্ট ও অস্পষ্ট আয়াত)।



2. বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা (তাফসির)
নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে কোরআনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং তাঁর সাহাবীগণ 

সেই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছেন। এই তাফসির বা ব্যাখ্যাগুলোকে উপেক্ষা করলে অনেক ক্ষেত্রে ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা থাকে।

📓 আল্লাহ বলেছেন:
"...এবং আমি তোমার প্রতি স্মরণিকা নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষের কাছে যা নাযিল করা হয়েছে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করো।"
(সূরা আন-নাহল: ৪৪)


3. আলেমদের ভূমিকা
আলেমদের কাজ হলো কোরআন ও হাদিসের বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা। তারা যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন, তবে এটি মানুষের জন্য উপকার বয়ে আনে। তবে আলেমদের উচিত নয় নিজেদেরকে কোরআন বোঝার একমাত্র মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

📚 নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের জ্ঞান দান করেন।"
(বুখারি: ৭১)

এই হাদিস স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে যেকোনো ব্যক্তি ইলম অর্জনের চেষ্টার মাধ্যমে দ্বীনের গভীর জ্ঞান লাভ করতে পারেন।


■ তৃতীয়ত: আলেমদের নির্ভরতা এবং ব্যক্তিগত অধ্যয়ন

এখানে মূল বিষয় হলো সঠিক সূত্র থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা:

1. সরাসরি কোরআন ও হাদিস পড়া অবশ্যই উত্তম।
2. তবে ভুল ব্যাখ্যার আশঙ্কা থাকলে নির্ভরযোগ্য তাফসির ও বিশুদ্ধ হাদিস ব্যাখ্যা পড়া উচিত।
3. আলেম বা শিক্ষকের সাহায্য নিতে হবে তাদের কাছ থেকে যারা বিশুদ্ধ জ্ঞানের ধারক এবং অন্ধ অনুসরণকারী নন।


কোরআন ও হাদিসের শিক্ষার দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত। কোনো ব্যক্তি নিজ প্রচেষ্টায় কোরআন-হাদিস পড়ে জ্ঞানার্জন করতে পারে এবং তা বোঝার চেষ্টা করা ইসলামের শিক্ষার মূল ভিত্তি। তবে কোরআন ও 

হাদিসের গভীর অর্থ, বিধি-বিধান ও প্রসঙ্গ বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় তাফসিরের জ্ঞান, আরবি ভাষার ব্যঞ্জনা, এবং নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহর সঠিক ব্যাখ্যা জানার প্রয়োজন রয়েছে।

মাদ্রাসা শিক্ষাপদ্ধতি বা আলেমদের ভূমিকা এই গভীর জ্ঞান সহজভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। তবে এটাও সত্য যে, কেউ যদি মনে করেন আলেমদের মাধ্যম ছাড়া কোরআন-হাদিস বোঝা সম্ভব নয়, সেটি কোরআনের স্পষ্ট বাণীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আল্লাহ তায়ালা কোরআনকে সহজ করেছেন, এবং প্রত্যেকের দায়িত্ব হলো তা শেখা, বোঝা ও প্রচার করা। এছাড়া জ্ঞান লাভ একমাত্র আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই মানুষ পেয়ে থাকে। এখানে মানুষের কোন কৃতিত্ব নেই তার নিজের জ্ঞান অর্জনের উপর। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে জ্ঞান দান করেন এ বিষয়ে কুরআন ও হাদিসে একাধিক উল্লেখ রয়েছে।

📓 "তোমাদেরকে যতটুকু জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তা অতি অল্প।"
সূরা বাকারা ১৮২

📓 "যাকে ইচ্ছা তিনি হিকমত (জ্ঞানের গভীরতা) দান করেন। আর যাকে হিকমত দান করা হয়, তাকে তো বিপুল কল্যাণ দান করা হয়।"
সূরা বাকারা ২৬৯

📓 "তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না।"
সূরা আলাক ০৫

📚 "আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে তিনি দ্বীনের জ্ঞান দান করেন।" (তিরমিজি, ২৬৪৫)
আল্লাহর পক্ষ থেকে জ্ঞান লাভ করা মানে তিনি ঐ ব্যক্তির জন্য কল্যাণ চান।


[ যদিও আপেক্ষিক দৃষ্টিতে ভাষা বোঝা এবং ভাষা শেখা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় মনে হলেও আল্লাহতালা এই বিষয়টি সম্পর্কে আরো উত্তম ভাবেই জানতেন। এই জটিলতা নিশ্চয়ই মানুষের উপর ছেড়ে দিলে মানুষ কেয়ামতের দিন এই সমস্যার অজুহাত দেওয়ার অনেক সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা পাবে। সুতরাং আল্লাহ মানুষের কল্যাণের জন্য কিভাবে সকল মানুষের নিজের ভাষায় কোরআনের কথাকে পৌঁছে দেবেন সেই ব্যবস্থার পরিকল্পনাও যথাযথভাবে করেছেন ] উদাহরণ- বলা যেতে পারে বর্তমানে এমন 

কোন স্থানে এমন কোন মানুষ পাওয়া যাবে কি? যে ইচ্ছা করলেই কোরআনের অর্থ এবং তাফসীর নিজ স্থান থেকে বের করে জানতে অক্ষম? না নেই। এটা কি আল্লাহ তাআলার এক অশেষ নেয়ামতের নিদর্শন নয়; যে আমাদের জন্য তিনি আরবি ভাষা থেকে তার কোরআনের অর্থগুলো আমাদের ভাষাতে সহজ ভাবে বোধগম্য করার ব্যবস্থা রেখেছেন??


তারপরেও এখানে দুটি বিষয়ে মূলত আলোকপাত করা প্রয়োজন:

1. কোরআন ও হাদিস নিজেই পরিপূর্ণ এবং সন্দেহমুক্ত।
2. কোরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যার প্রয়োজন কেন এবং কীভাবে তা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার সঙ্গে সমন্বয় করা যায়।


■ প্রথমত: কোরআন ও হাদিস পরিপূর্ণ এবং সন্দেহমুক্ত

📓 আল্লাহ তায়ালা কোরআনে স্পষ্টভাবে বলেছেন:
"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম। আর আমি ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।"
(সূরা আল-মায়িদা: ৩)

এখানে স্পষ্ট যে, ইসলামের শিক্ষার পূর্ণতা কোরআন এবং হাদিসের মধ্যেই রয়েছে। এটি এমন একটি বিধান যা সময়-কাল নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য প্রযোজ্য।

■ দ্বিতীয়ত: ব্যাখ্যার প্রয়োজন কেন?

কোরআন ও হাদিস পরিপূর্ণ সত্য হলেও কিছু বিষয় বুঝতে গিয়ে মানুষকে যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়, তা মূলত সন্দেহ বা ত্রুটি নয় বরং মানুষের জ্ঞানগত সীমাবদ্ধতা।

1. কোরআনের শাব্দিক অর্থ এবং প্রসঙ্গ:
কোরআন শরীফের অনেক আয়াতের শাব্দিক অর্থের চেয়ে প্রসঙ্গ ও উদ্দেশ্য বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন:

📓 আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"নামাজ কায়েম করো।" (সূরা বাকারা: ৪৩)


এখানে "নামাজ" কীভাবে পড়তে হবে, কত রাকাত হবে, কীভাবে রুকু ও সিজদা করতে হবে—এসব বিষয়ে হাদিসের সাহায্য ছাড়া আমরা সম্পূর্ণ জানতে পারব না।


2. মুহকাম ও মুতাশাবিহ আয়াত:
কোরআনে দুই প্রকার আয়াত রয়েছে:

মুহকাম (স্পষ্ট ও সুস্পষ্ট): যেমন, নামাজ, রোজা, হজ, যাকাতের বিধান।

মুতাশাবিহ (রহস্যময় বা অপ্রত্যক্ষ অর্থপূর্ণ): যেমন আল্লাহর গুণাবলি, কেয়ামতের সময়, জান্নাত ও জাহান্নামের কিছু বর্ণনা।


📓 আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
"...যারা তাদের অন্তরে কুটিলতা রাখে, তারা মুতাশাবিহ আয়াতের পেছনে লেগে থাকে।..."
(সূরা আলে ইমরান: ৭)

সুতরাং, মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে, যেন 

তারা নিজের যুক্তি দিয়ে ভুল ব্যাখ্যা না করে।


3. নবীজির ব্যাখ্যা (তাফসির):
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেই কোরআনের ব্যাখ্যা করেছেন এবং সেই ব্যাখ্যা ছাড়া কোরআনের অনেক আয়াত আমরা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারব না।

📓 আল্লাহ বলেছেন:
"এবং আমি তোমার প্রতি স্মরণিকা নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষের কাছে যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করো।"
(সূরা আন-নাহল: ৪৪)

নবীজির এই ব্যাখ্যাগুলোই হাদিসের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে।


■ তৃতীয়ত: বর্তমান যুগে সরাসরি অনুবাদ পড়া

বর্তমান যুগে প্রযুক্তির সাহায্যে সহজে অনুবাদ পড়া সম্ভব। তবে অনুবাদ পড়ার সময় কিছু সতর্কতা রাখা জরুরি:


ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার ঝুঁকি:
ইবলিস তার যুক্তি দিয়ে আদেশ অমান্য করেছিল। তাই ব্যক্তি যদি নিজস্ব যুক্তি বা মতামত দিয়ে কোরআন ব্যাখ্যা করে, তাহলে বিভ্রান্তির সম্ভাবনা থাকে।

মূল বক্তব্য—কোরআন ও হাদিসই যথেষ্ট এবং তাতে সন্দেহ নেই; এটি সম্পূর্ণ সঠিক। কোরআন পড়া, বোঝা এবং তা অনুসারে আমল করা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব। তবে কোরআনের গভীরতা, শৃঙ্খলা এবং ব্যাখ্যা করার জন্য নবীজির সুন্নাহ ও বিশ্বস্ত আলেমদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

📓 আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"তোমরা যদি না জানো, তাহলে যারা জ্ঞানী তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করো।"
(সূরা আন-নাহল: ৪৩)

★এখানে মূল উদ্দেশ্য হলো—বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করা এবং বিভ্রান্তি এড়ানো। কোরআন ও হাদিসে যা স্পষ্ট রয়েছে, তা অটল বিশ্বাসের সাথে গ্রহণ করতে হবে। কোনো ব্যাখ্যা যদি তার সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়।★

• সুতরাং:
1. কোরআন ও হাদিস সরাসরি পড়া এবং বোঝার চেষ্টা করা উচিত।
2. কোনো অস্পষ্টতা বা বিভ্রান্তি দেখা দিলে, প্রকৃত জ্ঞানী ও বিশ্বস্ত আলেমদের সাহায্য নেওয়া উচিত।
3. ব্যক্তিগত যুক্তি দিয়ে ভুল ব্যাখ্যা থেকে বিরত থাকা জরুরি।

এভাবেই আমরা কোরআন ও হাদিসের শিক্ষাকে বিশুদ্ধ ও পরিপূর্ণভাবে ধারণ করতে পারব।

এই পর্যন্ত সম্পূর্ণ কোরআন এবং হাদিসের আলোকে আলোচনা করে বোঝা গেল কুরআনের ব্যাখ্যা হাদীসের মধ্যে আল্লাহর রাসূলের জীবন এবং কর্মের মধ্যে স্পষ্টভাবেই পাওয়া যায়। সুতরাং কোন সন্দেহ নেই যে কোরআন এবং হাদিস এই দুইটি বিষয়ের মধ্যে পরিপূর্ণ জ্ঞান এবং ইসলামের সঠিক জীবন পরিচালনার বিধান রয়েছে। আল্লাহ তালাই আমাদের জন্য বর্তমান প্রযুক্তির উসিলায় এই কোরআন ও হাদিসের অনুবাদ, অর্থ, ব্যাখ্যা ও তাফসীর আমাদের কাছে সরাসরি পৌঁছে দেওয়ারও ব্যবস্থা করেই 

রেখেছেন। সুতরাং যে কোন ব্যক্তি যে কোন বিষয়ে সরাসরি কোরআন ও হাদিস থেকে জানার চেষ্টা করবে নিঃসন্দেহে সে পথভ্রষ্ট হবে না। এবং যখন কেউ হাদিস থেকে কোন কিছু দেখে সেই অনুযায়ী আমল করবে তা সে বুঝুক আর না বুঝুক তবুও তার জিম্মাদারি হযরত মোহাম্মদ সাঃ কেয়ামতের দিন নিবেন ইনশাল্লাহ। কিন্তু যে কোন ব্যক্তি যদি কোরআন এবং হাদিসের কথার উপর নিজস্ব বুদ্ধি এবং যুক্তি দ্বারা কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে আর সেই সিদ্ধান্তকে প্রচার করে তাহলে তার জিম্মাদার আর নবীজি হবেন না। আছে সকল ব্যক্তিগণ ওই প্রচার করা সিদ্ধান্তর ওপর আমল করবে তারাও আর নবীজির জিম্মাদারির আয়ত্তের ভিতর থাকবেন না। কোরআন এবং হাদিসের কথাগুলো ওকে নিজস্ব যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করে নতুন সিদ্ধান্ত বা অর্থ বের করার সুযোগ নেই। ইবলিশও নিজের যুক্তি ব্যবহার করে পথভ্রষ্ট হয়েছিল। মুসলমানের সফলতা কোরআন এবং হাদিসে যা আছে তা সরাসরি বুঝে নিজে বিশ্বাস করা এবং তার ওপর আমল করার মধ্যে রয়েছে। নাকি না যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করার মধ্যে থাকে। আর যদি কেউ কুরআন ও হাদিস কে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করে কিছু সিদ্ধান্ত দেয় তবে তা সম্পূর্ণ ঐ ব্যক্তির পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত মতামত তা কখনোই শরীয়াতের 

আইন কিংবা ইসলামের বিধান হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পাবেই না।


এই বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ইসলামের মূল শিক্ষার একটি গভীর দিককে তুলে ধরে। হ্যাঁ, কোরআন এবং হাদিসই ইসলামের পরিপূর্ণ জ্ঞান এবং সত্য। এগুলো আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সরাসরি নাযিলকৃত এবং নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয়েছে। সুতরাং, কোরআন এবং হাদিস নিজেই ইসলামের পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয় এবং এদের বাইরে নতুন কিছু গ্রহণের প্রয়োজন নেই।


■ প্রথমত: কোরআনের পরিপূর্ণতা সম্পর্কে আল্লাহর ঘোষণা

1. 📓 "আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম।"
(সূরা আল-মায়িদা: ৩)

এখানে দ্বীনের পূর্ণতা ঘোষণা করা হয়েছে। কোরআন 

এবং নবীজির সুন্নাহ ছাড়া দ্বীনের কোনো নতুন ব্যাখ্যার বা চিন্তাধারার প্রয়োজন নেই।


2. 📓 "এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যাতে তারা এর আয়াত নিয়ে চিন্তা করে এবং বুদ্ধিমানরা শিক্ষা গ্রহণ করে।"
(সূরা সাদ: ২৯)

এখানে বলা হয়েছে কোরআনের প্রতি গভীর চিন্তা করার কথা। তবে এই চিন্তা অর্থাৎ তাদাব্বুর মানে কোরআনের বাইরে নতুন কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করানো নয়।


■ দ্বিতীয়ত: নবীজির হাদিসের ভূমিকা

নবীজির হাদিস বা সুন্নাহ কোরআনের ব্যাখ্যা এবং বাস্তব অনুশীলন। নবীজির জীবন ও তাঁর কথাগুলো ছাড়া অনেক কোরআনীয় আয়াতের অনুশীলন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

📚 "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম হল সেই ব্যক্তি, যে নিজে 
কোরআন শিখে এবং অন্যকে শেখায়।"
(বুখারি: ৫০২৭)

এখানে নবীজি স্পষ্ট করে দিয়েছেন কোরআন শিখা এবং তা শেখানোই ইসলামের মেরুদণ্ড। হাদিস এই শিক্ষা ও অনুশীলনের দিকনির্দেশনা দেয়।


■ তৃতীয়ত: আলেমদের ভূমিকা ও সীমাবদ্ধতা

এটি সত্য যে আলেমদের কাজ হলো কোরআন ও হাদিসের সঠিক জ্ঞান মানুষকে পৌঁছে দেওয়া। তবে তাদের ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা বা যুক্তি ইসলামিক বিধানের উৎস নয়।

1. 📓 আল্লাহ বলেছেন:
"তোমরা যদি না জানো, তাহলে যারা জ্ঞানী তাদেরকে জিজ্ঞাসা করো।"
(সূরা আন-নাহল: ৪৩)

এটি কোনো ব্যক্তি আলেমদের অন্ধ অনুসরণ করার আহ্বান নয়; বরং তাদের কাছে সঠিক ব্যাখ্যা জানতে সাহায্য চাওয়ার আহ্বান।


2. যদি কোনো আলেম কোরআন ও হাদিসের বিপরীতে মত দেন বা নিজের ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেন, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।


📚 নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"আমার পরে তোমাদের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আসবে, যারা কথা বলবে এমনভাবে, যা তোমরা শুননি, তাদের থেকে দূরে থাকো।"
(মুসলিম: ১৮৪৮)


■ চতুর্থত: সার্বজনীন সত্যের ভিত্তি

আমার মূল পয়েন্ট হলো, কোরআন ও হাদিসই যথেষ্ট এবং তা সার্বজনীন সত্য। এটি সম্পূর্ণ সঠিক। কোন ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিতে পারেন না। ইসলামের আসল ভিত্তি হলো আল্লাহর বাণী (কোরআন) এবং নবীজির সুন্নাহ (হাদিস)। যেখানে আল্লাহতালা নিজে মানুষকে কুরআন পড়ার জন্য হুকুম করছে, সেখানে এখন কেউ যদি বলে কোরআনের অর্থ আমরা পড়লে বুঝবো না। তাহলে 

এটা অনেকটা সেই ঈসা আলাই সালাম এর জানার ঘটনা স্মরণ করায়ে দেয়; যখন ঈসা আঃ সালামের আসমানি কিতাব শুধুমাত্র সেই সময়ের ধর্মযাজকদের পড়ার অধিকার ছিল। সাধারণ মানুষ সেই কিতাব পড়ার অনুমতি পেতো না। তাই তাদেরকে তখন ধর্মীয় কিছু জানতে হলে সেই ধর্মযাজকদের কাছেই হাজির হতে হতো আর ধর্মযাজকরাও তো মানুষ, তারাও ভুল ত্রুটি এবং শয়তানের ফেতনা থেকে মুক্ত নয়। এক পর্যায়ে তারা তাদের নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী তাদের কিতাবকে পরিবর্তন করে ফেলতে শুরু করলো। কিন্তু এই ব্যবস্থা আর এই প্রথা সম্পন্ন উল্টে যায় আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম যখন উম্মতের জন্য কোরআন নিয়ে আসলেন। কোরআন সবার পড়ার ও জানার জন্য মুক্ত এবং আবশ্যক। এটিই কেয়ামত পর্যন্ত সকলের জন্য জ্ঞান ও হেদায়েতের একমাত্র পথস্বর।


                         ☆ সবশেষ কিছু কথা ☆

1. কোরআন এবং হাদিস ইসলামের পরিপূর্ণ উৎস, যা মানবজীবনের সব বিষয়ে নির্দেশনা দেয়।

2. কোরআনের ভাষা ও অর্থ বোঝা সহজতর করা হয়েছে, এবং বর্তমানে অনুবাদের মাধ্যমে তা আরও সহজে উপলব্ধি করা যায়।

3. আলেমদের ভূমিকা সহায়ক, তবে তাদের ব্যাখ্যা ইসলামের মূল উৎস নয়।

4. যদি কোনো ব্যক্তি সরাসরি কোরআন ও হাদিস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং তা অনুসরণ করে, তাতে তার দ্বীনি জীবনে কোনো ত্রুটি থাকবে না। তবে তাকে সতর্ক থাকতে হবে যেন নিজের যুক্তি দিয়ে ভুল ব্যাখ্যা না করে। নিজস্ব সিদ্ধান্তের উপর নিজে আমল করা যেতে পারে; কিন্তু তা প্রচার কোনোভাবেই উচিত নয় যা সরাসরি কুরআন এবং হাদিস থেকে পরিষ্কার পাওয়া যাবে না।


                       বিশ্বাস ও চর্চার সমন্বয়:

ইসলাম যুক্তি দিয়ে বিচার করে নয়; বরং বিশ্বাসের ভিত্তিতে আল্লাহর বাণী এবং নবীজির সুন্নাহ গ্রহণ করা হয়। কোরআন ও হাদিসের যথাযথ অনুসরণই আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার চাবিকাঠি।


"তোমরা কোরআনের যা জানো, তা অনুসরণ করো এবং তোমরা যা জানো না, তা আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও।"
(মোটাদ্রষ্টিভাবে হাদিসের অর্থ)


             প্রকৃত কোরআন ও হাদিসের বক্তব্য:

১. কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী যা জানা যায় তা অনুসরণ করা:

📓আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"তোমরা যা জানো না, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ এবং অন্তর—প্রত্যেকটি বিষয়ে হিসাব নেওয়া হবে।"
(সূরা বনী ইসরাইল: ৩৬)

এখানে স্পষ্টতই বলা হয়েছে অন্ধ অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং আল্লাহর বিধান মেনে চলার কথা বলা হয়েছে।

২. অজ্ঞতার ক্ষেত্রে আল্লাহর প্রতি ভরসা রাখা:


যদি কোনো বিষয় বোঝা না যায়, আল্লাহর প্রতি ভরসা রেখে তাঁকে প্রশ্নের উত্তর দানের জন্য প্রার্থনা করতে হবে।

📓আল্লাহ বলেন:
"...তোমরা যদি না জানো, তাহলে যারা জ্ঞানী তাদেরকে জিজ্ঞাসা করো।"
(সূরা আন-নাহল: ৪৩)

এখানে অজ্ঞতা দূর করতে জ্ঞানীদের কাছে যাওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তবে সেই জ্ঞানীদের কেউ শুধুমাত্র কুরআন ও হাদিসের দলিলের সহ পথ দেখাতে হবে, নাকি না নিজস্ব ব্যক্তিগত চিন্তার ও মনোভাবকে সিদ্ধান্ত হিসেবে জানাবে।


মনে রাখতে হবে আজ আমি ইসলামের ভেতরে নিজের যে সিদ্ধান্তকে মানুষের সামনে দাবি করলাম, কিয়ামতের দিন আমার সেই দাবির ওপর যথাযথ গ্রহণযোগ্য দলিল ও ভিত্তি দেখাতে হবে এবং আল্লাহর সামনে আমার দাবিকে সঠিক ও সত্য বলে প্রমাণ করতে হবে। আমি নিজে জানতাম না আর 

অন্যের থেকে শুনে তা যাচাই না করে আমল করেছি; এমন কথা সেদিন গ্রহণযোগ্য হবে না। নবীজি নিজেও নিরক্ষর ছিলেন আল্লাহ তায়ালা হিকমতের সাথে তাকে দিয়েই দ্বীন প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাই নিজের যুক্তি বা অন্যের দেওয়া মতামতের উপর নির্ভর করে আমার না করে, সরাসরি কোরআন হাদিসের থেকে নির্দেশনা গ্রহণ করাই উত্তম। সেক্ষেত্রে কেয়ামতের দিন কোরআন এবং হাদিসকে দলিল হিসেবে অন্তত পেশ করার সুযোগ পাওয়া যাবে যদিও প্রমাণ করতে না পারি। তবুও কোরআন ও হাদিসের দলিল যথেষ্ট আমার দাবি সত্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য পাওয়ার জন্য। তবে হ্যাঁ এইটুকু সাহায্য অবশ্যই জ্ঞানীদের কাছ থেকে নেওয়া উচিত যখন কোন বিষয়ে কিছু জানার প্রয়োজন হবে তার নিয়ম ও ইসলামী আদেশ সম্পর্কে কি আছে তা, তবে জেনে নেওয়ার পর সেটি অবশ্যই নিজ উদ্যোগে যাচাই করে দেখা আবশ্যক।

📓 “তোমরা যা সম্পর্কে জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ এবং অন্তর—প্রত্যেকটি বিষয়ে হিসাব নেওয়া হবে।“
(সূরা বনী ইসরাইল: ৩৬)

📓 “হে ঈমানদারগণ! যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখবে, যেন অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়কে ক্ষতিগ্রস্ত না করো এবং পরে তোমাদের নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে হয়।“
(সূরা আল-হুজুরাত: ৬)
[ কার অন্তরে পাপাচার আছে আর কার অন্তরে নেই তা একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন ]

📚 “যে ব্যক্তি কোনো কথা যাচাই না করে বলল এবং তাতে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলো, সে সেই ক্ষতির দায় বহন করবে।“
(তিরমিজি: ১৯৭৮)

📚 “এক ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা কিছু শোনে তা (যাচাই না করে) বলে বেড়ায়।“
(সাহিহ মুসলিম: ৫)

 

Comments

More Interesting Topics

খ্রিষ্টানদের বড়দিন আর মুসলমানদের ধ্বংসের দিন

শরীয়তের পোশাকের সুন্নত ও নীতিমালা

প্রশংসা করার কুফল ও সঠিক পদ্ধতি