সুন্নতের মধ্যে ধরন ও তারতম্য এবং গ্রহণযোগ্যতা

》 সুন্নতের মধ্যে ধরন ও তারতম্য এবং গ্রহণযোগ্যতা《

নবীজিকে নিয়ে কেউ কটুক্তি করলে তাকে হত্যা করা যাবে কি যাবে না?

অনেকেরই জানা নেই যে, হাদিসের মধ্যে প্রধানত দুই ধরনের সুন্নত রয়েছে। হাদিসকে ইসলামি শরিয়তে বিভিন্নভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে বলা কথা এবং কৃতকর্ম - এই দুই ধরনের হাদিসকে আলাদা আলাদা নামে চিহ্নিত করা হয়। নিম্নে তা ব্যাখ্যা করা হলো:

১. কওলি হাদিস (حديث قولي):

সংজ্ঞা: নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে উচ্চারিত বক্তব্য, নির্দেশ, উপদেশ, বা আদেশকে কওলি হাদিস বলা হয়।

উদাহরণ: নবী করিম (সাঃ) বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি অন্যায় কাজ দেখবে, সে তা হাত দিয়ে পরিবর্তন করবে; যদি না পারে, তবে জিহ্বা দিয়ে বলবে; আর যদি তাও না পারে, তবে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করবে, আর এটি হলো ঈমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর।"
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৯)

২. ফে’লি হাদিস (حديث فعلي):

সংজ্ঞা: নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজের করা কাজ বা কর্মকে ফে’লি হাদিস বলা হয়। এটি তার দৈনন্দিন জীবনের আচার-আচরণ, ইবাদত-বন্দেগি বা যেকোনো কর্মকাণ্ডের বর্ণনা।

উদাহরণ: সাহাবীরা বর্ণনা করেছেন যে নবী করিম (সাঃ) কীভাবে নামাজ পড়তেন, কিভাবে ওজু করতেন, রমজানের রোজা রাখতেন ইত্যাদি।
যেমন:
"নবী করিম (সাঃ) প্রথমে হাত উঠিয়ে তাকবির বলতেন, এরপর ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকের ওপর রাখতেন।"
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৩৬)

এই দুটি ছাড়াও অতিরিক্ত ধরন রয়েছে:

তাকরিরি হাদিস (حديث تقريري):

এটি নবী করিম (সাঃ)-এর সামনে সাহাবীদের কোনো কাজ সম্পাদিত হলে তিনি তা অনুমোদন বা সমর্থন করলে তাকরিরি হাদিস হিসেবে গণ্য হয়।

উদাহরণ:
সাহাবিদের কোনো একটি কার্যক্রম যদি নবী করিম (সাঃ) দেখে থাকেন এবং এতে কোনো আপত্তি না করে থাকেন, তাহলে সেটিও শরীয়তের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

কওলি হাদিস: নবী (সাঃ)-এর বক্তব্য বা কথা।
ফে’লি হাদিস: নবী (সাঃ)-এর কাজ বা কর্ম।
তাকরিরি হাদিস: নবী (সাঃ)-এর মৌন অনুমোদন।

● এখন একটি বিশেষ বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করা যাক। যদি এমন কোন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় যেখানে নবীজি কোন বিষয়ে মুখে বলেছেন একরকম কিন্তু সেই একই কাজে তিনি করেছেন অন্যরকম। অথবা সাহাবীরা কখনো তার সামনে কোন কিছু করেছেন একরকম; তিনি সম্মতি দিলেও, তিনি পরে মুখে বলেছেন কিংবা নিজে করেছেন অন্যরকম। অর্থাৎ একই বিষয়ে এই তিন ধরনের সুন্নতের মধ্যে যদি তারতম্য এবং ভিন্নতা দেখা যায় তাহলে উম্মতের জন্য কোনটি সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য হবে?


যদি কওলি (বক্তব্য), ফে’লি (কাজ) এবং তাকরিরি (অনুমোদন) হাদিসের মধ্যে কোনো একটি বিষয়ে দ্বন্দ্ব বা ভিন্নতা দেখা দেয়, তাহলে শরীয়ত অনুসারে নির্ধারণ করতে হয় কোনটি সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য হবে। এর পেছনে ফিকহি একটি বিশেষ প্রক্রিয়া রয়েছে। তা নিচের সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে বোঝা যাক:

১. কওলি হাদিস (নবীর কথার হাদিস):

অগ্রাধিকার: সাধারণত কওলি হাদিস সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ধরা হয়। কারণ এটি সরাসরি নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মুখনিঃসৃত কথা এবং এটি বোঝাতে কোনো সন্দেহ বা ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ থাকে না।

কারণ: নবীর কথাগুলো স্পষ্ট নির্দেশনা বা নীতি প্রদান করে, যা প্রত্যক্ষভাবে শরীয়তের বিধান নির্ধারণে সহায়ক।

২. ফে’লি হাদিস (নবীর কাজের হাদিস):

অগ্রাধিকার: কওলি হাদিস না থাকলে বা কোনো কওলি হাদিসের অর্থ বুঝতে ফে’লি হাদিস প্রয়োজন হলে ফে’লি হাদিস গ্রহণযোগ্য হবে। তবে নবীর কাজগুলো কখনো কখনো ব্যক্তি হিসেবে তার বিশেষ অবস্থান বা প্রেক্ষাপটে করা হতে পারে, যা সাধারণ উম্মতের জন্য প্রযোজ্য নাও হতে পারে।

উদাহরণ: নবী করিম (সাঃ)-এর অধিক রাতজাগা ইবাদত; যদিও উম্মতের জন্য মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশনা আছে।

৩. তাকরিরি হাদিস (নবীর অনুমোদনের হাদিস):

অগ্রাধিকার: তাকরিরি হাদিস তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন কওলি বা ফে’লি হাদিসের সাথে সরাসরি দ্বন্দ্ব নেই। এটি সাধারণত পরোক্ষ অনুমোদন, তাই এটি কওলি বা ফে’লি হাদিসের চেয়ে কম অগ্রাধিকার পায়।

কারণ: এটি মৌন সম্মতির মাধ্যমে শরীয়ত নির্ধারণ করে, কিন্তু নবীর সরাসরি নির্দেশনার মতো স্পষ্ট নয়।

যদি দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়:

১. প্রথম পর্যায়:
কওলি হাদিসকে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ধরা হয়, কারণ এটি নবীর সরাসরি কথা।

২. দ্বিতীয় পর্যায়:
কওলি হাদিস স্পষ্টভাবে বোঝা না গেলে ফে’লি হাদিসের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা হয়।

৩. তৃতীয় পর্যায়:
যদি কওলি ও ফে’লি হাদিসের মধ্যে স্পষ্ট কোনো দ্বন্দ্ব থাকে, তাহলে কওলি হাদিস প্রাধান্য পায়।

৪. চতুর্থ পর্যায়:
যদি কওলি এবং ফে’লি হাদিসের পরেও কোনো বিষয় অমীমাংসিত থাকে, তখন তাকরিরি হাদিসকে বিবেচনা করা হয়।

শরীয়তের দৃষ্টিতে, তিন ধরনের হাদিসের মধ্যে কওলি হাদিস সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য। এরপর ফে’লি হাদিস, এবং সবশেষে তাকরিরি হাদিস প্রাধান্য পায়। এই প্রক্রিয়ায় ফিকহি ইমামগণ, হাদিস বিশেষজ্ঞ এবং উসূলুল-ফিকহের নীতিমালা অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

পরিশেষে আলোচনার একদম শুরুতে যে প্রশ্নটি আমি রেখেছিলাম নবীজিকে নিয়ে কটুক্তি করার ব্যাপারে; এবার নিজেরা সেই বিষয়গুলি যাচাই করে দেখবেন। নবীজি এই বিষয়ে মুখে কিছু বলেছেন কিনা, নিজে কখনো এমন কাজ করেছেন কিনা, আর সাহাবীদেরকে অনুমোদন করেছেন কিনা? তিনটি বিষয়ের কথার মধ্যে যদি মানুষ হত্যা করার ব্যাপারে সমর্থন পান এবং নিজে যদি সেটিকে সঠিক হিসেবে বিবেচনা করেন তাহলে আপনার কাজের হিসাব আপনার আর আপনি আখারিতে তখনই সে হিসাব দিতে পারবেন যখন সেটা নিজে যাচাই বাছাই করবেন।

Comments

More Interesting Topics

খ্রিষ্টানদের বড়দিন আর মুসলমানদের ধ্বংসের দিন

শরীয়তের পোশাকের সুন্নত ও নীতিমালা

প্রশংসা করার কুফল ও সঠিক পদ্ধতি