হিন্দুশাস্ত্র ও পুরান মতে মূর্তি পূজার যৌতিকতা

অনেক সময় যথাযথ সঠিক প্রশ্ন এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে তথ্য না জানার কারণে; আমাদের কাছে অন্যান্য ধর্মের অনেক দিক পরিষ্কার ভাবে বোধগম্য হয় না। ফলস্বরূপ অনেক মুসলমান ব্যক্তিই অন্য ধর্মের ব্যাপারেও সঠিক হওয়ার এবং অন্য ধর্ম অবলম্বনকারীদের কোন দোষ বা ভুল না থাকার ব্যাপারে সম্মতি প্রকাশ করার চেষ্টা করেন। সেক্ষেত্রে আমাদের এই জাতীয় বিষয়গুলো নিয়ে যথাসম্ভব পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক নতুবা কোন মন্তব্যে কিংবা সিদ্ধান্তে যাওয়া নির্বোধের পরিচয় ।


• হিন্দু শাস্ত্র কিংবা পুরান অনুযায়ী হিন্দু ধর্মগ্রন্থে কি মূর্তি বানানোর ব্যাপারে কোন নির্দেশনা পাওয়া যায় কিংবা মূর্তি পূজা করার ব্যাপারে কোন বৈধতা আছে কিনা? আর যদি এমনটা থেকে থাকে তাহলে কোন সময় থেকে হিন্দু ধর্মে মূর্তি পূজার প্রচলন শুরু হয় এবং কেন?


হিন্দু শাস্ত্র এবং পুরাণে মূর্তি পূজা নিয়ে বিভিন্ন দিক এবং দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। হিন্দু ধর্মের বহুমাত্রিক গ্রন্থসমূহে মূর্তি পূজা সম্পর্কে উল্লেখ পাওয়া যায়, তবে এর উৎস, কারণ এবং সময়কাল নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ রয়েছে। নিচে এ বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো:

১. বেদ এবং মূর্তি পূজা

প্রাচীন হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বেদ (যেমন ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, অথর্ববেদ) মূলত নিরাকার ঈশ্বরের আরাধনার কথা বলে। বেদে ঈশ্বরকে এক এবং সর্বশক্তিমান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে তাঁর কোনো রূপ নেই।

বেদের ঐতিহ্যে মূর্তি পূজার উল্লেখ পাওয়া যায় না। এটি মূলত নিরাকার ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের ধ্যানকে গুরুত্ব দেয়।


২. উপনিষদ এবং নিরাকার দর্শন

উপনিষদে (যা বেদের অন্তিম অংশ) নিরাকার ঈশ্বরের দর্শনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এটি আধ্যাত্মিক চিন্তার গভীরতা নিয়ে আলোচনা করে এবং মূর্তির পরিবর্তে মনোযোগ, ধ্যান, এবং সাধনার মাধ্যমে ঈশ্বর উপলব্ধির উপর গুরুত্ব দেয়।


৩. মূর্তি পূজার উৎপত্তি

মূর্তি পূজা প্রচলিত হতে শুরু করে পুরাণ যুগে (খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ বা ৫ম শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত)। পুরাণগুলো (যেমন বিষ্ণু পুরাণ, শিব পুরাণ, দেবী ভাগবত পুরাণ) নিরাকার ঈশ্বরকে সাকার রূপে উপস্থাপন করতে শুরু করে। এক্ষেত্রে পুরান গ্রন্থগুলো কিন্তু নতুন ভাবে মানুষের নিজস্ব মতামত থেকে কিংবা বলা বাহুল্য কল্পনা থেকে রচিত পুস্তক সমূহ। এই কারণেই কল্পনা থেকে উল্লেখ করলাম কারণ হিন্দু ধর্মে তারাও দাবি করে পুরান গ্রন্থ মনীষীদের স্মৃতির থেকে দৃশ্যমান চিত্র অনুযায়ী লেখা হয়। উল্লেখ্য এই মনীষীদের কিংবা তাদের রচিত এই পুরান গ্রন্থ গুলোর গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে কিন্তু সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক কোন ঘোষণা কোন গ্রন্থেই পাওয়া যায় না।

তবে এতে ভক্তদের সহজে ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য মূর্তি বা রূপের মাধ্যমে উপাসনার ধারণা দেওয়া হয়। এই ধারণা অনুযায়ী, মূর্তি হলো ঈশ্বরের প্রতীক, যা ভক্তির অনুভূতি জাগ্রত করে। সুতরাং বোঝাই গেল এটি সম্পূর্ণ সেই সময়কার মানুষদের নিজস্ব মনগড়া -ভালোলাগা থেকে তাদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী গড়ে ওঠা এক প্রকার মানব সৃষ্টি প্রথা ছিল। এটি কোনভাবেই সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক কোন নির্দেশনার মধ্যে কখনোই ছিলনা।


৪. ভগবদ গীতা এবং মূর্তি পূজা

ভগবদ গীতাতে মূর্তি পূজার কোনো সরাসরি নির্দেশনা নেই। তবে গীতায় ব্যক্তিগত ভক্তি ও আরাধনার গুরুত্বের কথা বলা হয়েছে। এটি ঈশ্বরের নিরাকার ও সাকার দুই ধরনের রূপের মধ্যে কোন ধরনের ব্যাপারেই বিশেষ কোন নিষেধাজ্ঞা কিংবা প্রথা গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে উল্লেখ করেনি।


৫. মূর্তি পূজার বৈধতা

স্মৃতি ও পুরাণ অনুসারে, মূর্তি পূজা বৈধ এবং এটি ভক্তির একটি মাধ্যম। এটি বলা হয় যে নিরাকার ঈশ্বরকে সরাসরি উপলব্ধি করা কঠিন, তাই মূর্তির মাধ্যমে ধ্যান ও উপাসনা সহজ হয়।

উদাহরণস্বরূপ, বিষ্ণু বা শিবের মূর্তি, দুর্গা বা কালী দেবীর মূর্তি ভক্তদের কাছে প্রতীকী রূপে পূজিত হয়। কিন্তু এখানে এতক্ষন আলোচনার পর এটা পরিষ্কার এবং সবাইকে স্বীকার করতেই হবে যে, এই প্রতীকী রূপ কোন ধর্মীয় আদেশ কিংবা নির্দেশনা থেকে আসেনি বরং এসেছে মানুষের মনের সৃষ্টি আবেগ থেকে।


৬. মূর্তি পূজার প্রচলন কেন শুরু হলো?

সাংস্কৃতিক প্রয়োজন: মূর্তি পূজা সম্ভবত মানুষের চাক্ষুষ ও আচারিক উপাসনার অভ্যাস থেকে উদ্ভূত। এটি ভক্তির বহিঃপ্রকাশের একটি সহজ মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়।

স্থানীয় ঐতিহ্য: স্থানীয় বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে হিন্দু ধর্মে মূর্তি পূজা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করে।

বৌদ্ধ ও জৈন প্রভাব: বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মেও মূর্তি উপাসনার প্রচলন ছিল, যা হিন্দু ধর্মের মূর্তি পূজার বিকাশে প্রভাবিত করে।


৭. সমালোচনা এবং বিতর্ক

আদ্যন্ত বিরোধিতা: কিছু হিন্দু সম্প্রদায় (যেমন আর্য সমাজ) মূর্তি পূজার বিরোধিতা করে এবং বেদে নিরাকার ব্রহ্মার উপাসনার ওপর জোর দেয়।

ভক্তি বনাম দর্শন: অনেক হিন্দু দার্শনিক মূর্তি পূজাকে প্রতীকী হিসেবে দেখেন এবং নিরাকার ঈশ্বরকেই সর্বোচ্চ বলে মনে করেন।
* মনে রাখতে হবে যেকোনো ধর্মের ব্যাপারে কোন কিছু যেমন অন্তরের ইচ্ছা অনুযায়ী নতুন করে নিজেদের সুবিধার্থে সংযোজক করা যায় না, তেমনি ইচ্ছামত কোন কিছুর পালন করারও সুযোগ নেই *

• হিন্দু ধর্মে কিংবা হিন্দু শাস্ত্রে সরাসরি ঈশ্বর কিংবা সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে দেওয়া "গ্রন্থ বা বাণী" কোনটি? অথবা হিন্দু ধর্মের মূল গ্রন্থ যেখান থেকে হিন্দু ধর্ম উৎপত্তি সেই গ্রন্থটি কোনটি?

হিন্দু ধর্মে সরাসরি "ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে দেওয়া গ্রহণযোগ্য বাণী" বলে কোনো নির্দিষ্ট ধারণা নেই, যেমনটা ইসলাম বা খ্রিস্টধর্মে কোরআন বা বাইবেলের ক্ষেত্রে রয়েছে। তবে হিন্দু ধর্মের মূল গ্রন্থ ও এর উৎস সম্পর্কে জানা যাক।

হিন্দু ধর্মের মূল গ্রন্থ ও তাদের উৎস:

হিন্দু ধর্মের মূল ভিত্তি প্রাচীন বেদসমূহ, যা এই ধর্মের সবচেয়ে প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। এগুলোকে "আপৌরুষেয়" (অর্থাৎ মানুষের দ্বারা রচিত নয়) এবং "ঋষিদের দ্বারা প্রকাশিত" বলে মনে করা হয়। এর মানে হল, বেদকে ঈশ্বরের জ্ঞান হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা ঋষিরা ধ্যানের মাধ্যমে উপলব্ধি করেছেন।

১. বেদসমূহ (হিন্দু ধর্মের মূল গ্রন্থ)

বেদ চারটি:

1. ঋগ্বেদ: এটি হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ, যেখানে সূক্ত বা স্তোত্রের মাধ্যমে দেবতাদের প্রার্থনা করা হয়েছে।


2. যজুর্বেদ: এটি মূলত যজ্ঞ এবং ধর্মীয় আচারবিধি সংক্রান্ত মন্ত্রসমূহ ধারণ করে।


3. সামবেদ: এতে সংগীত বা সুরের মাধ্যমে স্তোত্র পাঠের কথা বলা হয়েছে।


4. অথর্ববেদ: এটি জাদু, চিকিৎসা, এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োগমূলক বিষয় নিয়ে আলোচনা করে।



২. উপনিষদসমূহ

বেদের অন্তর্গত শেষ অংশকে উপনিষদ বলা হয়, যা হিন্দু ধর্মের দার্শনিক ভিত্তি স্থাপন করে। এতে ঈশ্বর, আত্মা, এবং ব্রহ্মাণ্ডের প্রকৃতি নিয়ে গভীর আলোচনা করা হয়েছে।

উপনিষদে মূলত নিরাকার ঈশ্বরের (ব্রহ্ম) ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।


৩. গীতাসমূহ (যেমন ভগবদ গীতা)

ভগবদ গীতা মহাভারত মহাকাব্যের একটি অংশ এবং হিন্দুদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জ্ঞান ও উপদেশের সংকলন, যেখানে ধর্ম, কর্ম, এবং ভক্তি নিয়ে গভীর দার্শনিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

গীতাকে ঈশ্বরের বাণী হিসেবে অনেকেই স্বীকৃতি দেন। অথচ পুরো গীতার ভিতরে ঈশ্বর স্বয়ং নিজে কোথাও তার বাণী বলে একটি বাক্য কেও দাবি করতে দেখা যায় না। 
একই রকম আরেকটি মজার ঘটনা দেখা যায় তাদের দেব-দেবীর ক্ষেত্রেও। যেখানে হিন্দুরা বিভিন্ন নামের চরিত্রকে তাদের দেব দেবী বলে দাবি করে। অথচ এমন কোন গ্রন্থে, এমন কোন বাক্য পাওয়া যায় না; যেখানে ওই চরিত্রগুলো, নিজে নিজেকে ভগবানের রূপ কিংবা ভগবানের অংশ কিংবা নিজেকে স্বয়ং দেব-দেবী বলে দাবি করেছে।


৪. পুরাণসমূহ

পুরাণ (যেমন বিষ্ণু পুরাণ, শিব পুরাণ, দেবী পুরাণ) হল পৌরাণিক কাহিনি এবং ধর্মীয় গল্পের সংকলন। এগুলো হিন্দু ধর্মের ইতিহাস, আচার, এবং দেবদেবীদের জীবন নিয়ে লেখা হয়েছে।

এগুলো বেদ-উত্তর যুগে রচিত, এবং মূর্তি পূজা ও ভক্তির ধারণা প্রচলিত করে।


হিন্দু ধর্মের উৎপত্তি নিয়ে বিশ্লেষণ

হিন্দু ধর্মের নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠাতা নেই। এটি একটি প্রাচীন ঐতিহ্য এবং দীর্ঘকাল ধরে বিকাশমান বিশ্বাস ও আচারবিধির সমষ্টি।

হিন্দু ধর্মের শিকড় পাওয়া যায় ইন্দো-আর্য সভ্যতা এবং সিন্ধু-সারস্বতী সভ্যতায়।

এর মূল ভিত্তি হলো বেদ, যা খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ৫০০ সালের মধ্যে রচিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়।

হিন্দু শাস্ত্রে "সরাসরি ঈশ্বরের বাণী" বলে কোনো বিষয় নেই। বরং, ""ঋষিদের"" মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানকে ঈশ্বরীয় বলে <মনে করা> হয়। কথাটি আপনি আবার যাচাই করে দেখবেন ব্যাপারটা ""মনে করা হয়"" কিন্তু ব্যাপারটি কোন পরিষ্কার দলিল থেকে প্রমাণিত পাওয়া যায় না।

বেদকে শাশ্বত ও প্রাকৃতিক নিয়মের একটি প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়।


হিন্দু ধর্মের মূল গ্রন্থ হলো বেদসমূহ, যা থেকে ধর্মের প্রধান দিকনির্দেশনা ও আচারবিধি নির্ধারিত হয়। তবে সরাসরি ঈশ্বরপ্রদত্ত গ্রন্থ হিসেবে এর স্বীকৃতি নির্ভর করে বিশ্বাস ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির উপর। হিন্দু ধর্মের বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রকৃতি এটাই নির্দেশ করে যে এটি কোনো একক গ্রন্থ বা বাণীর উপর নির্ভরশীল নয়, বরং একটি বহুমাত্রিক ঐতিহ্য।

এখন প্রশ্ন হল একটি ধর্মগ্রন্থ বা একটি ধর্মীয় জীবন ব্যবস্থা যা কিনা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে প্রদত্ত হচ্ছে; সেখানে কিভাবে এত বিশৃঙ্খলা কিংবা বহুমাত্রিক দিক থাকতে পারে? যখন এমন বহুমাত্রিক হওয়ার কারণে তা সংরক্ষণ এবং পরিপূর্ণ পালন করা অনেক ক্ষেত্রেই পথভ্রষ্টের সম্ভাবনা রাখে। বরং একটি সুশৃংখল এবং পরিপূর্ণ কিতাব এবং খন্ডহীন বাণী দ্বারাই তো সৃষ্টিকর্তা তা সহজেই সকল মানুষের জন্য প্রেরণ করতে পারেন এবং সেটিই তিনি করবেন; এমনটাই সৃষ্টিকর্তা হিসেবে তার চরিত্রে ও বৈশিষ্ট্যগত গুণের স্বাভাবিকতাকে প্রকাশ করে।


• বেতসমূহ এবং পুরান সমূহ এই দুই গ্রন্থের ভেতর উৎপত্তি সময়ের মধ্যবর্তী ব্যবধান কত বছরের? আর ২ গ্রন্থের মধ্যে উৎপত্তি মধ্যবর্তী সময়ে বহু বছরের ব্যবধান হওয়া সত্ত্বেও দুইটি গ্রন্থ কিভাবে একটি ধর্মের অর্থাৎ হিন্দু ধর্মের সাথে সম্পর্ক করে তোলে?


বেদসমূহ এবং পুরাণসমূহের উৎপত্তির মধ্যে উল্লেখযোগ্য সময়ের ব্যবধান রয়েছে। এই দুই ধরনের গ্রন্থের উৎপত্তি ও ধর্মীয় অবস্থান সম্পর্কে আরও বিস্তারিত আলোচনা করলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।


১. বেদসমূহের উৎপত্তি সময়

বেদ হলো হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে প্রাচীন এবং মূল গ্রন্থ। এগুলোর রচনার সময়কাল নিয়ে গবেষকদের মধ্যে কিছুটা ভিন্নমত রয়েছে। তবে সাধারণত অনুমান করা হয়:

বেদের রচনা খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ৫০০ সালের মধ্যে সম্পন্ন হয়।

এগুলো মৌখিক ঐতিহ্য হিসেবে শুরু হয় এবং পরে লিখিত আকারে সংরক্ষিত হয়।

বেদে মূলত আধ্যাত্মিক জ্ঞান, যজ্ঞবিধি, এবং নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনার কথা বলা হয়েছে।


২. পুরাণসমূহের উৎপত্তি সময়

পুরাণসমূহ রচিত হয়েছে বেদ-উত্তর যুগে, যখন সমাজের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটছিল। পুরাণের সময়কাল হলো:

প্রাথমিক পুরাণগুলোর রচনা খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ বা ৫ম শতাব্দীতে শুরু হয়।

এগুলোর বিকাশ ও সংকলন খ্রিস্টীয় ৩য় থেকে ১০ম শতাব্দী পর্যন্ত চলে।

পুরাণে দেবতাদের কাহিনি, মূর্তি পূজার প্রচলন, এবং সামাজিক রীতিনীতির উপর জোর দেওয়া হয়েছে।


৩. উৎপত্তির মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান

বেদ এবং পুরাণের মধ্যে সময়ের ব্যবধান সাধারণত ১০০০ থেকে ২০০০ বছরের মতো।

বেদ হলো শ্রুতি (শ্রবণ দ্বারা প্রাপ্ত জ্ঞান), যা ঈশ্বরীয় জ্ঞান হিসেবে বিবেচিত।

পুরাণ হলো স্মৃতি (স্মরণীয় বা রচিত কাহিনি), যা সমাজের দৈনন্দিন চাহিদা ও বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।


৪. কিভাবে একই ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত?

বেদের আধ্যাত্মিক দর্শন ও পুরাণের পৌরাণিক কাহিনি একত্রে হিন্দু ধর্মকে একটি সামগ্রিক কাঠামো দেয়। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে:

(ক) ধর্মীয় বিবর্তন:

বেদের সময়:

ধর্মীয় উপাসনা ছিল মূলত নিরাকার ঈশ্বর এবং যজ্ঞ কেন্দ্রিক।

এটি ছিল আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও মহাজাগতিক শক্তি সম্পর্কে।


পুরাণের সময়:

সামাজিক বাস্তবতার কারণে ধর্ম আরও সুনির্দিষ্ট এবং সহজবোধ্য করা হয়।

দেবতাদের সাকার রূপ ও কাহিনির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ধর্মের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়।



(খ) একই ধর্মের স্তম্ভ

বেদ হলো হিন্দু ধর্মের মূল ভিত্তি, যা আধ্যাত্মিকতা এবং ঈশ্বরের নিরাকার ধারণা প্রদান করে।

পুরাণ হিন্দু ধর্মের ব্যবহারিক ও সাংস্কৃতিক দিকগুলো তুলে ধরে, যেখানে দেবতাদের কাহিনি, মূর্তি পূজা, এবং ধর্মীয় আচারের প্রচলন ঘটে।


(গ) ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ

বেদ এবং পুরাণের মধ্যবর্তী সময়ে সমাজে ধর্মীয় চর্চার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসে।

গ্রাম্য সংস্কৃতি, রাজনীতি, এবং আচার-আচরণ একত্রে মিশে যাওয়ায় পুরাণে নতুন ধর্মীয় রীতি সৃষ্টি হয়, যা বেদের সঙ্গে ঐতিহ্যগত সংযোগ বজায় রেখেই বিকশিত হয়।


(ঘ) ঋষিদের ভূমিকা

ঋষিরা বেদ ও পুরাণ উভয় সময়েই ধর্মের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তারা পুরাণে বেদের জটিল দর্শনকে সরলীকৃত করেছেন, যাতে সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারে। অর্থাৎ পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ গুলোর কোথাও সৃষ্টিকর্তা নিজ থেকে মানুষ জাতির জন্য কোন বিষয়ের উপর সরাসরি আদেশ নিষেধ কিংবা নির্দেশনা দিচ্ছেন না, দেননি। বরং ঋষিদের কে নিজস্ব চেষ্টা ও শক্তি ব্যবহার করে ধ্যানের মাধ্যমে জীবন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাগুলোর জ্ঞান উপলব্ধি দিয়ে অর্জন করতে হয়েছে। যেখানে এই জ্ঞানগুলো আমাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার একটি অন্যতম দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত হয়। 



#
উপসংহার

যুক্তিগত দিক থেকে দেখতে গেলে তথ্য বিশ্লেষণ করে এটিই জানা যায় যে, হিন্দু ধর্মে ঈশ্বর কর্তৃক সরাসরি কোন গ্রন্থ কিংবা বাণী নেই; যেখানে সৃষ্টিকর্তা নিজে এই দাবি করে বলছে এটি তার বাণী অথবা গ্রন্থ। উপরন্ত দেখা যাবে দীর্ঘ বছরের ব্যবধানে দুইটি আলাদা আলাদা গ্রন্থের উৎপত্তি ঘটেছে, তাদের নিজস্ব তৈরি ধর্মের কিছু বিষয়ের ক্ষেত্র গুলোকে একটা পরিপূর্ণ রূপ দেওয়ার জন্য। এখানে আরো একটি দিক উল্লেখযোগ্য যে কেন মানুষ পরবর্তীতে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী নতুন গ্রন্থ তৈরি করল এবং মানুষ নিজে কিভাবে ক্ষমতা কিংবা অধিকার পেল তাদের ধর্মীয় বিষয়গুলো সংস্করণ করার। অর্থাৎ পুরান গ্রন্থ যখন মানুষ কর্তৃক সংস্কৃত হয়ে গেল তখন বলাই বাহুল্য তাদের আদি ধর্ম নিঃসন্দেহে পরিবর্তন ঘটল। অর্থাৎ যুক্তির সাপেক্ষে যদি ধরেও নেই বেদ গ্রন্থগুলো ধর্মীয় দিক থেকে সঠিক/সত্য কিংবা গ্রহণযোগ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়; তাহলেও পুরান গ্রন্থের সাথে সম্পর্কযুক্ত করার দ্বারা তা অর্থাৎ বেদ নিজস্ব মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। বেদের এমন অনেক অধ্যায়ে দলিলসহ প্রমাণ দেওয়া সম্ভব যেখানে মূর্তি পূজা করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ পরিষ্কার নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যায়। এমনকি শেষ জামানায় এক বিশেষ ব্যক্তি যিনি কিনা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে ধর্ম প্রচারের জন্য পৃথিবীতে আসবে এবং বিশাল এক পৃথিবীর পরিবর্তন ঘটাবে এমন ব্যক্তিত্বের পরিচয় এর কথাও উল্লেখ পাওয়া যায়; নাম এবং এলাকার সরাসরি পরিচয় সহ। এই ব্যাপার গুলো নিয়ে অনেক হিন্দুরা নিজেরাই কিছুই জানেন না। বেদগুলো পরিষ্কারভাবে পড়ে বোঝার চেষ্টা করলে দেখা যাবে সেখানে পরবর্তী জামানায় মানুষদেরকে গুরুত্বের সাথে কোন বিশেষ ব্যক্তির জন্য অপেক্ষা করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, এমন আরো অনেক সঠিক পথ অবলম্বনের ব্যাপারেও নির্দেশনা পরিষ্কারভাবে দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়েছে।



আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দেখলে দেখা যাবে- সর্বক্ষেত্রেই হিন্দু শাস্ত্র কিংবা ধর্মের ইতিহাস থেকে তাদের গ্রন্থ এবং বাণীগুলো ঋষি কিংবা কোন মনীষীর পক্ষ থেকে পাওয়া যায়। যেখানে বাস্তবিক অর্থে তাদের দেবতা কিংবা তাদের ঘটনাগুলোর সাক্ষী হিসেবে কোন ব্যক্তির উল্লেখ দেখা যায় না; বরং কিছু ঋষি কিংবা মনীষীর পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো উল্লেখযোগ্য ভাবে রচিত পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে যুক্তি তর্কে অনেক অংশেই যদিও বা বেদ গ্রন্থ সমূহ আংশিক কিংবা কিছুটা অর্থে গ্রহণযোগ্যের কাতারে থাকে কিন্তু বাকি অর্থাৎ বেদ ব্যতীত অন্য যা কিছু নতুন করে হিন্দু ধর্মের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে পরবর্তীতে সেই সব কিছুই অগ্রহণযোগ্য এবং ভিত্তিহীন বলেই বিবেচিত হবে। কারণ সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই কোন ঋষি কিংবা মনীষীকে তার প্রেরিত বার্তাবাহক হিসেবে কোথাও নির্ধারণ করেননি সুতরাং আমরাও কোন ব্যক্তি বিশেষে তার মন কিংবা দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ধর্মীয় ক্ষেত্রে কোন সংস্করণ ঘটাতে পারিনা। কারণ ধর্মীয় বিধি-বিধান মানে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার বিধি-বিধান, যা দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র তিনি ই ধারণ করেন। কারোর পক্ষ থেকে কোন ধর্মীয় বার্তা গ্রহণ করার জন্য সর্বপ্রথম সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে ওই ব্যক্তির ব্যাপারে এ কাজের বৈধতা প্রমাণিত হওয়া প্রয়োজন। সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট করে কোন ব্যক্তির ব্যাপারে পরিষ্কার ধর্ম প্রচারের বিষয়ে ঘোষণা ছাড়াই ওই ব্যক্তি যা বলবে তা ধর্মের বিধি-বিধান বলে মেনে নেওয়া কখনই ধর্মীয় কোন বিচক্ষণতা হতে পারে না।



আর বহু কাল আগে থেকেই এত বিশৃঙ্খলা এবং সঠিক তথ্যের অপূর্ণতার কারণেই হিন্দু ধর্ম অবলম্বন কারী যারা তারা তাদের নিজস্ব ধর্ম সম্পর্কে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় জ্ঞানশূন্য অবস্থায় থাকেন এবং পারিবারিক গত ভাবেও ধর্মীয় শিক্ষার কোন পদক্ষেপও দেখা যায় না। কারণ সুশৃংখল কোন ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার সুযোগ বা পদ্ধতি সেখানে বিদ্যমান নেই। তবুও নিজস্ব আগ্রহ দ্বারা যদি সত্যিই সৃষ্টি জগতের এবং সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা হয় তাহলে নিশ্চয়ই এমন অনেক খন্ড-খন্ড তথ্য সামনে খুঁজে পাওয়া যাবে, যা আপেক্ষিক ভাবে যুক্ত করে বিশ্লেষণ করার দ্বারা সত্যিকারের ধর্মীয় শিক্ষা এবং ধর্মীয় জ্ঞান লাভ করা সম্ভব।

আলোচক: জি কে এম জারিফ উর রহিম। 

Comments

More Interesting Topics

খ্রিষ্টানদের বড়দিন আর মুসলমানদের ধ্বংসের দিন

শরীয়তের পোশাকের সুন্নত ও নীতিমালা

প্রশংসা করার কুফল ও সঠিক পদ্ধতি