সৃষ্টিকর্তা
"যুক্তি ও বিশ্বাসের লড়াই"
যেখানে বিজ্ঞান শুধু দর্শক।
বহু আগে থেকে যুগের পর যুগ ধরে নাস্তিক এবং আস্তিকদের মধ্যে এক ধরনের তর্ক-বিতর্ক চলে আসতে দেখা যায়।
নাস্তিকদের দাবিগুলো শক্তিশালী এবং বিভ্রান্ত মুলক প্রমাণ করার জন্য সবথেকে বেশি ব্যবহৃত হতে দেখা গিয়েছে দর্শন বিদ্যার। ইতিহাসের কিছু জ্ঞানী ব্যক্তিদের দর্শনবিদ্যার ব্যবহারে উল্লেখ করে রেখে যাওয়া মনোরঞ্জক ধরনের কিছু নাস্তিকদের প্রশ্ন আজও বহুল আলোড়ন সৃষ্টি করে চলে আসছে।
বিশ্বাসীদের জন্য তাদের এই প্রশ্নগুলোর সাপেক্ষে যথার্থ উত্তর উপস্থাপন করার জন্য পর্যাপ্ত তথ্য বা তত্ত্ব উপস্থাপন করতে দেখা যায় না খুব একটা। আর দর্শন বিদ্যার সবথেকে প্রভাবশালী কৌশল পূর্ণ প্রয়োগ হল প্রশ্ন দিয়ে প্রশ্ন তৈরি করা অর্থাৎ প্রাডক্স বা যুক্তি চক্র সৃষ্টি করা। যা স্বাভাবিক দৃষ্টিতে মানুষদেরকে বিভ্রান্ত করতে যথেষ্ট শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
কিন্তু আমি যখন বহুদিনের গবেষণা থেকে এই ধরনের প্রশ্নগুলোকে দেখেছি এবং তা নিয়ে চিন্তা করেছে তখন খুবই দুর্বল ভিত্তি প্রশ্নগুলোর পিছনে খুঁজে পেয়েছে। এবং তাদের কিছু প্রশ্নের বিরুদ্ধে শক্তিশালী যুক্তিসম্পন্ন এবং বিজ্ঞানসম্মত উত্তর তুলে ধরতে সফলভাবে সক্ষম হয়েছে। যে বক্তব্যের বিরুদ্ধে কোন তথ্য দাঁড় করানো শুধু কঠিনই নয় বরং অসম্ভব প্রায়।
{ খুব সম্প্রতি ফেসবুক থেকে এমন এক নাস্তিক ভাইয়ের সাথে কথোপকথন থেকে উঠে আসা এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে প্রচারের চেষ্টা করলাম। (মূলত নিচে উল্লেখ করা পুরো আলোচনাটি আমি সেই নাস্তিক ভাইয়ের উদ্দেশ্যে লিখে পাঠিয়েছিলাম) }
১. "সব কিছুর একজন সৃষ্টিকর্তা দরকার"—এই ধারণার প্রকৃত ব্যাখ্যা
"সব কিছুর একজন সৃষ্টিকর্তা দরকার"—এই ধারণাটি সমস্যাযুক্ত, কারণ যদি সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা দরকার হয়, তবে সৃষ্টিকর্তারও সৃষ্টিকর্তা থাকা উচিত। কিন্তু এখানে আমরা একটি মৌলিক ভুল করছি।
কোথায় ভুল হচ্ছে?
"সৃষ্টিকর্তা" শব্দটি একটি পরিচিতি বা গুণ, যা কোনো কিছুর সৃষ্টি করার সঙ্গে সম্পর্কিত। সুতরাং, যখন কিছু সৃষ্টি হয়, তখনই "সৃষ্টিকর্তা" পরিচয়টি অস্তিত্ব লাভ করে। যদি কোনো কিছুই সৃষ্টি না হতো, তবে "সৃষ্টিকর্তা" পরিচয়টি অর্থহীন হতো।
একটি সহজ উদাহরণ দিই:
• একজন মা তখনই মা হন, যখন তিনি সন্তান জন্ম দেন। সন্তানের জন্মদানের আগ পর্যন্ত তার "মা" পরিচয় ছিল না, যদিও তিনি ব্যক্তিসত্তা হিসেবে বিদ্যমান ছিলেন।
• একইভাবে, যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি যখন সৃষ্টি শুরু করেন, তখনই "সৃষ্টিকর্তা" পরিচয়টি অর্থবহ হয়।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, "সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকর্তা কে?"
যিনি "সৃষ্টিকর্তা" তিনি নিজে সৃষ্টি নন। তিনি সৃষ্টির বাইরের অস্তিত্ব।
সুতরাং, সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকর্তা কে?—এই প্রশ্নটি ভুল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
• কারণ সৃষ্টিকর্তা হলেন সেই অনাদি অস্তিত্ব, যিনি নিজের থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ, যার কোনো শুরু নেই।
• বিজ্ঞান ও দর্শন বলে, অনন্ত সত্ত্বার অস্তিত্ব থাকা সম্ভব, যিনি নিজে সৃষ্ট নয়, বরং তিনি অস্তিত্বশীল সর্বোচ্চ বাস্তবতা।
২. বিগ ব্যাং-এর পূর্বে স্থান ও সময় ছিল না—কিন্তু সেটি সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে না
নাস্তিকদের মত, বিগ ব্যাং-এর পূর্বে স্থান ও সময় ছিল না; তাই “বিগ ব্যাং-এর আগে কী ছিল?”—এমন প্রশ্ন অর্থহীন।
এটি সত্য যে বিজ্ঞান স্বীকার করে, সময় এবং স্থান বিগ ব্যাং-এর পরেই অস্তিত্ব লাভ করেছে। কিন্তু এই যুক্তি থেকে আপনি যা বোঝানোর চেষ্টা করছেন, তা সম্পূর্ণভাবে যুক্তিসঙ্গত নয়।
কেন যুক্তিসঙ্গত নয়?
• বিজ্ঞান বলছে, বিগ ব্যাং-এর আগে সময় ছিল না, কিন্তু বিজ্ঞান কখনো বলেনি যে "বিগ ব্যাং-এর পূর্বে কিছুই ছিল না"।
• কোনো কিছুর আগে সময় না থাকা মানে এই নয় যে, সেটির অস্তিত্ব নেই।
ধরা যাক, একটি ১০ মিনিটের ভিডিও আছে, যেখানে ১০০টি ফ্রেম রয়েছে।
• একজন সাধারণ দর্শক ভিডিওটি সময়ের সাথে ফ্রেম বাই ফ্রেম দেখবে।
• কিন্তু যিনি ভিডিওটি তৈরি করেছেন, তিনি একসঙ্গে সব ফ্রেম দেখতে পারেন।
• সৃষ্টিকর্তার কাছে সৃষ্টির শুরু ও শেষ স্থির অবস্থায় একসঙ্গে বিদ্যমান, কারণ তিনি সময়ের বাইরের সত্তা। তার জন্য সময় স্থির অবস্থায় রয়েছে।
বিজ্ঞান যেহেতু "সময়ের শুরু" বলে, তাই সময়ের বাইরের একজন অস্তিত্ব থাকা যুক্তিসঙ্গত এবং সেটি সৃষ্টিকর্তার ধারণাকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
৩. কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন: শূন্যস্থান কি সত্যিই শূন্য?
বর্তমান বিজ্ঞান উল্লেখ করেছে কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন, যেখানে শূন্যস্থান থেকে কণা আপনা-আপনি তৈরি ও ধ্বংস হতে পারে। নাস্তিকবিদরা বলছেন, এ থেকেই মহাবিশ্বের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় এবং এর জন্য কোনো সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজন নেই।
কিন্তু এখানে ভুল হচ্ছে কোথায়?
• বিজ্ঞান "শূন্যস্থান" (Vacuum) এবং "কিছুই নেই" (Nothing) এক জিনিস বলে না।
• কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন আসলে একটি শূন্যস্থান যেখানে শক্তি আছে এবং যেখানে ভার্চুয়াল কণা তৈরি হতে পারে।
• এই কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন নিজেই এক ধরনের ফিজিক্যাল প্রক্রিয়া, যা আইন দ্বারা পরিচালিত হয়।
কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন = শূন্য থেকে কিছুর সৃষ্টি নয়
• কোয়ান্টাম ফিজিক্স বলে যে, শূন্যস্থানেও শক্তি থাকে এবং সেখানে কণা আপনা-আপনি সৃষ্টি ও বিনাশ হতে পারে।
• কিন্তু এটি প্রাকৃতিক নিয়মের মাধ্যমে ঘটে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে নয়।
• এই আইন এবং নিয়মগুলো কোথা থেকে এলো?
• যদি কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনকে স্বতঃস্ফূর্ত সৃষ্টি বলি, তবে এর জন্যও একটি নির্দিষ্ট কারণ থাকতে হবে।
শূন্য থেকে মহাবিশ্ব আসা = ধর্মীয় ধারণার সঙ্গে বিজ্ঞানও মিলে যায়
• বিজ্ঞান বলছে, কিছুই না থেকেও কিছু সৃষ্টি হতে পারে।
• ধর্মও বলছে, সৃষ্টিকর্তা শূন্য থেকেই সৃষ্টি সূচনা করেছেন, তিনি যা চান, তা হয়ে যায়।
• অর্থাৎ কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন আসলে ধর্মের ধারণাকেই আরও যুক্তিসঙ্গতভাবে উপস্থাপন করছে।
৪. বিজ্ঞানের পক্ষে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে সরাসরি অস্বীকার করা সম্ভব নয়
নাস্তিকরা বলে, "সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ নেই, তাই তিনি নেই"—এটি একধরনের যুক্তিগত ভ্রান্তি (Logical Fallacy)।
• বিজ্ঞান কখনো বলেনি যে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব নেই।
• বরং বিজ্ঞান এখনো নিশ্চিত নয়, কারণ বিজ্ঞানের ক্ষমতা সীমিত।
• সৃষ্টিকর্তা যদি সৃষ্টির বাইরের অস্তিত্ব হন, তবে বিজ্ঞানের মাধ্যমে তার অস্তিত্বকে পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
এটি অনেকটা কম্পিউটারের ভেতরে থাকা একটি প্রোগ্রামের পক্ষে কম্পিউটারের বাইরে থাকা প্রোগ্রামারকে বোঝার অসম্ভবতার মতো।
• সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকর্তা কে?—এই প্রশ্নটি অর্থহীন, কারণ সৃষ্টিকর্তা নিজেই অনাদি।
• বিগ ব্যাং-এর আগে সময় ছিল না—তাই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব থাকা আরও যুক্তিসঙ্গত, কারণ তিনি সময়ের বাইরের অস্তিত্ব।
• কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন শূন্যস্থান থেকে স্বতঃস্ফূর্ত সৃষ্টি প্রমাণ করে না, বরং এটি একটি প্রাকৃতিক নিয়মের মাধ্যমে ঘটে।
• বিজ্ঞান কখনো বলেনি সৃষ্টিকর্তা নেই—বরং বিজ্ঞান এ বিষয়ে নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছে।
সর্বশেষে বলা যায়:
"সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের সরাসরি প্রমাণ নেই"—এই যুক্তি যেমন তাঁর অস্তিত্ব অস্বীকার করে না, তেমনি "সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব নেই"—এই দাবিরও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
উভয় পক্ষের কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দেখানো সম্ভব না হওয়ার কারণে আস্তিক এবং নাস্তিক উভয় দলই একই অবস্থানে নিজেদের দাবি নিয়ে রয়েছেন। এই অবস্থায় শুধু তর্ক বা জোরপূর্বক অপরকে পরাজিত করা যায় না। এমনকি নিজ মন্তব্যের উপর শতভাগ সঠিক ও সত্য দাবিও করার সুযোগ থাকে না। এই অবস্থাতে উভয়পক্ষ আলোচনা করার এবং শুধুমাত্র নিজস্ব মত আদান-প্রদানের জন্য গ্রহণযোগ্যতা পায়।
সুতরাং, যুক্তি ও দর্শন থেকে বিচার করলে, সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব থাকাটাই একটি অধিক যৌক্তিক এবং সম্ভাব্য ব্যাখ্যা। যেগুলো নিরপেক্ষ এবং বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে সম্ভাব্য সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য তত্ত্বের উপস্থাপন করতে সক্ষম।
॥ লেখক/আলোচক -
》জি. কে. এম. জারিফ উর রহিম। (রাশিক)
#jarifurrahim #jarif #জারিফ #جَرِيفْ

Comments
Post a Comment